আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের পক্ষ থেকে হত্যার হুমকি পাওয়ার পর তুরস্ক সফর শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে দেশটি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে করে ফেরার কথা জানানো হলেও বাস্তবে বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে তাকে ছোট একটি সামরিক বিমানে তুলে দেওয়া হয়।
সোমবার প্রকাশিত The Washington Post-এর এক প্রতিবেদনে মার্কিন এক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নথির বরাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পকে বহনকারী বিমানটি ছিল মার্কিন বিমানবাহিনীর সি-৩২এ।
পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ছিল বিভ্রান্তির অংশ
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় গিয়েছিলেন ট্রাম্প। ওই সফরে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক যাত্রায় কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজটি ব্যবহার করা হয়।
তবে আঙ্কারা ছাড়ার সময় হঠাৎ করেই পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ট্রাম্প নিজেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, পুরোনো নীল-সাদা এয়ারফোর্স ওয়ানে করে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মাইল্ডেনহলে যাওয়ার মাধ্যমে তিনি পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনবেন।
একই সময়ে কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজটিও সেখানে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। বলা হয়েছিল, ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনারা বিমানটি ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু পরে জানা যায়, পুরো বিষয়টিই ছিল নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ। ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠানো হলেও পরে গোপনে তাকে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ক্যাটারিং ট্রাকে করে গোপনে বিমান বদল
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে ট্রাম্পকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে করে অপেক্ষমাণ সি-৩২এ সামরিক বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী সাংবাদিক ও হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই অবস্থান করছেন। সাংবাদিকদের ওই বিমানের প্রেস কেবিনের জানালার পর্দা বন্ধ রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে পাওয়া একটি বিশ্বাসযোগ্য হত্যার হুমকির পরই এই গোপন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানকে এ ক্ষেত্রে মূলত ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
সাংবাদিকদেরও অন্ধকারে রাখা হয়
বিমানের জানালার পর্দা বন্ধ রাখার কারণ জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভবত তারা একটি বিপজ্জনক ফ্লাইটে ছিলেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে তিনি গেলে সাংবাদিকেরাও তাঁর সঙ্গে যাবেন কি না—এমন মন্তব্যও করেন তিনি।
ট্রাম্পকে বহনকারী সি-৩২এ স্থানীয় সময় রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে যুক্তরাজ্যে পৌঁছায়। কয়েক মিনিট পর পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানও সেখানে অবতরণ করে।
তবে সি-৩২এ থেকে ট্রাম্প কখন এবং কীভাবে আবার পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১০টা ৫৬ মিনিটের দিকে ট্রাম্পকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। তিনি সাংবাদিকদের দিকে দুই আঙুল তুলে শান্তির প্রতীক দেখান, তবে তাদের সঙ্গে কথা বলেননি। পরে মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ শুভেচ্ছা বিনিময় করে কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজের দিকে যান।
হোয়াইট হাউসের বক্তব্য
ট্রাম্পের গোপনে তৃতীয় বিমানে যাত্রার বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভ চেউং নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনেন।
তিনি বলেন, কাতারের দেওয়া বিমানটিতে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ধরনের হুমকি রয়েছে এবং সেগুলো মোকাবিলায় প্রশাসন হাতে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে বলেও জানান তিনি।
হোয়াইট হাউস ওয়াশিংটন পোস্টকেও একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে। তবে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
কাতারের দেওয়া বিমান ঘিরেও বিতর্ক
ট্রাম্পের জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজ উপহার দেয়। ট্রাম্পের পছন্দ অনুযায়ী বিমানটির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নকশায় লাল, সাদা, গাঢ় নীল ও সোনালি রঙ ব্যবহার করা হয়েছে।
বোয়িংয়ের নতুন প্রজন্মের এয়ারফোর্স ওয়ান সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় অন্তর্বর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য বিমানটি নেওয়া হয়। পরে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এলথ্রি হ্যারিস টেকনোলজিস সেটি সংস্কার করে।
তবে দ্রুত সংস্কারের ব্যয় এবং বিমানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল।
আগেও নেওয়া হয়েছিল একই কৌশল
মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় বিভ্রান্তিমূলক বিমান ব্যবহারের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়।
২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের পাকিস্তান সফরের সময়ও একই ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল। সে সময় ক্লিনটন একটি পরিচয়বিহীন নির্বাহী উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন এবং একই সময়ে আনুষ্ঠানিক এয়ারফোর্স ওয়ানকে ডিকয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তুরস্ক সফরে ট্রাম্পকে ঘিরে সর্বশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সেই ধরনের কৌশলেরই আধুনিক প্রয়োগ বলে মনে করা হচ্ছে।

















