গালিবা আনতারা সোয়ারা
গণতন্ত্র—শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে নির্বাচন, ভোট আর জনপ্রতিনিধির কথা। কিন্তু গণতন্ত্র কি শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি এর পরিধি আরও বড় ? গণতন্ত্র মানে এমন একটি সমাজ, যেখানে একজন নাগরিক সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করতে পারেন, আবার সরকারের ভুল ও দায়িত্বহীনতার সমালোচনাও করতে পারেন। যেখানে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত পছন্দ না হলে প্রশ্ন তোলা যায়, কোনো সেবায় সমস্যা হলে তার সমাধান চাওয়া যায়। কারণ গণতন্ত্রে সরকার জনগণের জন্য—আর জনগণের সেই সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকারও থাকবে। একজন নাগরিক যেমন সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করবেন, তেমনি গ্যাস সংকট হলে প্রশ্ন করবেন—কেন গ্যাস নেই? বিদ্যুৎ না থাকলে জানতে চাইবেন—সমস্যা কোথায়? দ্রব্যমূল্য বেড়ে গেলে জানতে চাইবেন—এর কারণ কী, সমাধানই বা কী? সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বহীনতা বা অনিয়ম দেখা দিলে সেটিও তুলে ধরবেন। এসব প্রশ্ন সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়; বরং এগুলো একজন সচেতন নাগরিকের অধিকার ও দায়িত্ব। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—সরকারের প্রশংসা করার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি সমালোচনা করার অধিকারও থাকবে।
একটি দেশে মানুষ যদি নিজের ব্যক্তি স্বাধীনতা, অধিকার ও নাগরিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে না পারে, তাহলে সেই গণতন্ত্র কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন থেকেই যায়। মতের সঙ্গে মতের অমিল থাকতেই পারে। একজন সরকারের কোনো কাজকে ভালো বলতে পারেন, অন্যজন সেটির সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু ভিন্নমত প্রকাশের কারণে কাউকে চুপ করিয়ে দেওয়া গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের অন্যতম বড় জায়গা। একজন মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা, সমস্যা কিংবা মতামত সেখানে তুলে ধরতে পারেন। সংবাদমাধ্যমও মানুষের নানা সমস্যা ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয় সামনে আনে। তাই একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রয়োজনীয় স্বচ্ছতা থাকা জরুরি।
তবে স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও রয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা মানে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, কাউকে অপমান করা কিংবা গুজব ছড়ানোর অধিকার নয়। নিজের কথা বলার পাশাপাশি অন্যের মতামতকে সম্মান করাও গণতান্ত্রিক আচরণের অংশ। গণতন্ত্র শুধু সংসদে বা নির্বাচনের মাঠে চর্চা হয় না। এর চর্চা হয় পরিবারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সামাজিক সংগঠনে, সংবাদমাধ্যমে এবং আমাদের দৈনন্দিন কথাবার্তায়। যেখানে একজন শিক্ষার্থী তার মতামত প্রকাশ করতে পারে, একজন নাগরিক নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে এবং একজন মানুষ সরকারের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারে—সেখানেই গণতন্ত্রের চর্চা রয়েছে।
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস। এই দিনে গণতন্ত্র নিয়ে শুধু আলোচনা করলেই হবে না; বরং আমাদের ভাবতে হবে—আমরা কি সত্যিই এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছি, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে? যেখানে সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা যেমন স্বাভাবিক, তেমনি ভুলের সমালোচনাও স্বাভাবিক? মনে রাখতে হবে, সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়। সমালোচনা মানে ভুল শুধরে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। একজন নাগরিক যখন প্রশ্ন করেন, তখন শুধু নিজের জন্য থাকে না বরং সেই সমাজের সবার হয়ে কথা বলে।
গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন মানুষ শুধু ভোট দেওয়ার সময় নাগরিক হয়ে ওঠে না; বরং প্রতিদিন নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকে। তাই গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। গণতন্ত্র মানে কথা বলার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের অধিকার, প্রশ্ন করার সাহস, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা এবং সরকারের জবাবদিহি।
যেখানে মানুষ নির্ভয়ে বলতে পারে—“এই কাজটি ভালো হয়েছে, তাই আমরা প্রশংসা করছি”, আবার একই সঙ্গে বলতে পারে—“এই সমস্যার সমাধান চাই, কারণ এটি আমাদের অধিকার ও জীবনের সঙ্গে জড়িত”—সেখানেই গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে জীবন্ত।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
















