সাকিবুল হাছান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গদ্যসাহিত্যে সমাজ, সংস্কৃতি ও সমকালীন বাস্তবতার বহুমাত্রিক প্রকাশ নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের গবেষক মিরাজুল ইসলাম।
‘কাজী নজরুল ইসলাম : গদ্যশিল্পীর সমাজ-সংস্কৃতির বীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণায় নজরুলের প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস, নাটক, অভিভাষণ ও চিঠিপত্রের নানা দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে ছিলেন আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবদুর রহিম গাজী। বহির্বিভাগীয় পরীক্ষক ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনমুন গঙ্গোপাধ্যায়।
সম্প্রতি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে সেমিনার ও ভাইভা-ভোস অনুষ্ঠিত হয়। এর পরই মিরাজুল ইসলামের পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের বিষয়টি চূড়ান্ত হয়।
গবেষণায় নজরুলের গদ্যে ঔপনিবেশিক শাসন, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতার মতো বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ও ‘কুহেলিকা’র মতো উপন্যাস এবং নজরুলের বিপুলসংখ্যক প্রবন্ধ ও চিঠিপত্রও বিশ্লেষণের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নজরুলের গদ্যে তৎসম, তদ্ভব ও দেশজ শব্দের পাশাপাশি আরবি-ফারসি, আঞ্চলিক ও বিদেশি শব্দের ব্যবহার কীভাবে তাঁর ভাষাকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে, গবেষণায় তারও বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে। বাক্যগঠন, শব্দচয়ন, ছন্দ, অলংকার, ব্যঙ্গ-রস ও বক্তব্যের বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে নজরুলের গদ্যশৈলীর শক্তিমত্তাও তুলে ধরা হয়েছে।
মিরাজুল ইসলামের গবেষণার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—নজরুলের গদ্যকে শুধু সাহিত্যিক মূল্যায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও সমকালীন জীবনের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক অনুসন্ধান করা। মানুষের জীবনযন্ত্রণা, শোষণ, বৈষম্য, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং মানবিক চেতনা কীভাবে নজরুলের গদ্যে প্রতিফলিত হয়েছে, গবেষণায় তা তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে, নজরুলের সাহিত্যিক সত্তার বিভিন্ন প্রকাশের মধ্যে তাঁর সমাজসচেতনতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গভীর আন্তঃসম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিতির আড়ালে যে তীক্ষ্ণ সমাজসচেতন, মানবিক ও বহুমাত্রিক গদ্যশিল্পী নজরুল রয়েছেন, গবেষণাটি সেই দিকটিকে নতুনভাবে পাঠের সুযোগ তৈরি করেছে।
ভাইভা-ভোসে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষিকা, পিএইচডি গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ডিন ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মির রেজাউল করিম, অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান, অধ্যাপক ড. চাঁদমালা খাতুন এবং কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক এ.কে.এম. আনোয়ারুজ্জামান।
নজরুলের গদ্যকে সমাজ-সংস্কৃতি ও সমকালীন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই গবেষণা বাংলা সাহিত্য ও নজরুলচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মিরাজুল ইসলামের গবেষণার মধ্য দিয়ে নজরুলের গদ্যসাহিত্যের নতুন কিছু দিক পাঠক ও গবেষকদের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।















