নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর কৌশলের কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গ্রাম ও জেলা শহরগুলোতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। কোথাও কোথাও দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে দেশে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুতের দাম বাড়লেও সংকট কাটেনি
জুন মাসে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া পরিশোধে এখনো বড় চাপ রয়েছে পিডিবির ওপর।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, দাম বাড়ানোর ফলে পিডিবির আয় বাড়তে কিছুটা সময় লাগবে। নতুন করে বকেয়া না বাড়লেও আগের বকেয়া ধাপে ধাপে পরিশোধ করতে হবে।
বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারের ভর্তুকির চাপ।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গত দেড় দশকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে না থাকলেও সেগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক চাপ বেড়েছে।
২৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা, তবু ঘাটতি
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট।
অর্থাৎ ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতার বড় একটি অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
এর অন্যতম কারণ গ্যাসের সংকট। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।
কয়লা ও গ্যাসে টান, তেলও ব্যয়বহুল
বিদ্যুৎ উৎপাদনের আরেকটি বড় উৎস কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছিল। রোববার রাত থেকে কেন্দ্রটি আবার উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেছে।
তবে কেন্দ্রটির বকেয়া পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। নির্ধারিত সময়ে বিল না পেলে আগামী মাস থেকে কয়লা সরবরাহে সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রেও কয়লার সংকটে উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি।
এ পরিস্থিতিতে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও খরচের কারণে সেগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে না।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস ও কয়লা—দুই উৎসেই সরবরাহ কমেছে। তেলচালিত কেন্দ্র সারাদিন চালানো ব্যয়বহুল হওয়ায় সন্ধ্যার পর লোডশেডিং কমাতে উৎপাদন বাড়ানো হয়। মধ্যরাতের পর আবার উৎপাদন কমানো হলে লোডশেডিংও বেড়ে যায়।
পায়রা ও আদানিকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে সোমবার বিকেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছে পিডিবি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ওই সময় পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। উৎপাদন আরও বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদানির কেন্দ্রকেও উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিমাণে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১১ আগস্ট রাত থেকে ১২ আগস্ট সকালের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভুগছে গ্রামাঞ্চল
ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি এলাকায় আপাতত বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই। তবে ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি বেশ ভিন্ন। সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
ফেনীতে পিডিবি ও পল্লী বিদ্যুতের সম্মিলিত চাহিদা প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। জেলার একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছে।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ জানিয়েছেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে।
কোথাও ২৪ ঘণ্টায় বিদ্যুৎ মিলছে ৫ ঘণ্টারও কম
নেত্রকোনার পূর্বধলার বাঘবেড় গ্রামের বাসিন্দা আক্কাস আলী আকন্দ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন জানান, জেলার বিদ্যুতের চাহিদা ১৫৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট। ফলে বাধ্য হয়ে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। চুনারুঘাটের দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় জানান, চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে প্রক্রিয়াজাত পাতা নষ্ট হয়ে বাগানগুলোকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
নীলফামারীর ডোমারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক গ্রাহক ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টারও কম সময় বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
গরমে বাড়ছে জনদুর্ভোগ
বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে তীব্র গরম যোগ হওয়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, দিনের বড় সময় বিদ্যুৎ থাকে না। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে শিশুরা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি করে। রাতেও নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘুমানোর সুযোগ হচ্ছে না।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
সব মিলিয়ে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ ঘাটতি, তেলভিত্তিক বিদ্যুতের উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া এবং বিতরণ পর্যায়ে সরবরাহের ঘাটতির কারণে বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংকট দ্রুত না কাটলে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।


















