সকল ভাষা শুনতে কান লাগে না

2 বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা

 

কথা বলতে আমরা মুখ ব্যবহার করি, আর শুনতে কান। তাই আমরা সাধারণত মনে করি, ভাষা মানেই শব্দ। কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটি ভাষা আছে, যে ভাষা শুনতে কান লাগে না। হাতের ইশারা, মুখের ভাব ও শরীরের নানা সংকেতের মাধ্যমে মানুষ নিজের কথা প্রকাশ করতে পারেন। এটিই সাংকেতিক ভাষা।

 

কিন্তু একটু ভাবুন তো—একজন মানুষ যে ভাষায় প্রতিদিন কথা বলেন, সেই ভাষা যদি আশপাশের কেউ না বোঝেন, তাহলে তাঁর কেমন লাগে?

 

ধরুন, একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে বসে আছেন। শিক্ষক পড়াচ্ছেন, বন্ধুরা কথা বলছেন, সবাই প্রশ্ন করছে। কিন্তু তিনি নিজের কথা সহজে বলতে পারছেন না। আবার অন্যের কথাও ঠিকভাবে বুঝতে পারছেন না। তখন সমস্যাটা কোথায়? তাঁর মেধায়, নাকি আমাদের ব্যবস্থায়?

 

একটি দিবস, একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

২৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস। ২০১৭ সালে জাতিসংঘ এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৫১ সালের এই দিনে বিশ্ব বধির ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৬ সালে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে।

 

এ বছরের প্রতিপাদ্য “Declaring Deaf People’s Human Rights”। সহজ করে বললে, বধির মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিই এবারের প্রতিপাদ্যের কেন্দ্রে রয়েছে।

 

এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাংকেতিক ভাষা শুধু যোগাযোগের একটি মাধ্যম নয়; এটি মানুষের পরিচয়, অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

 

সংখ্যার পেছনে মানুষ

বিশ্ব বধির ফেডারেশনের হিসাবে, পৃথিবীতে ৭ কোটির বেশি বধির মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বধির সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেন। তাঁদের ৮০ শতাংশের বেশি উন্নয়নশীল দেশে বাস করেন। পৃথিবীতে ৩০০টিরও বেশি সাংকেতিক ভাষা রয়েছে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৪৩ কোটি মানুষ এমন শ্রবণশক্তির সমস্যায় আছেন, যাঁদের চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের প্রয়োজন।

 

তবে শুধু সংখ্যা দিয়ে মানুষকে বোঝা যায় না।

তাঁদের কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ শিল্পচর্চা করেন। তাঁদেরও স্বপ্ন আছে, ইচ্ছা আছে, ভালোবাসা আছে। অন্য সবার মতো তাঁরাও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান। কিন্তু অনেক সময় শুধু যোগাযোগের সমস্যার কারণে তাঁরা পিছিয়ে পড়েন।

 

সমস্যা কোথায়?

সমস্যা শুধু শুনতে না পাওয়ায় নয়। বড় সমস্যা হলো—আমরা তাঁদের সঙ্গে ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে পারি না।

 

একটি শিশু ছোটবেলা থেকে সাংকেতিক ভাষা শেখার সুযোগ পেল না। পরিবারের মানুষও জানেন না কীভাবে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। ফলে শিশুটি নিজের প্রয়োজনও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না।

 

শিক্ষাজীবনেও একই সমস্যা দেখা যায়। শিক্ষক সাংকেতিক ভাষা জানেন না, দোভাষী নেই, ভিডিওতে ক্যাপশন নেই। ফলে একজন শিক্ষার্থী শুধু ভাষাগত বাধার কারণে অনেক কিছু থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন।

 

চাকরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। একজন মানুষের যোগ্যতা আছে, কাজ করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু চাকরির সাক্ষাৎকারে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। অফিসের মিটিং বোঝার সুযোগ নেই। তখন সমস্যা তাঁর যোগ্যতায় নয়; সমস্যা আমাদের ব্যবস্থায়।

 

বাংলাদেশে আমরা কোথায়?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে অন্তত একটি প্রতিবন্ধিতা রয়েছে—এমন মানুষের সংখ্যা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৬০৪। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ দশমিক ০৭ শতাংশের প্রতিবন্ধিতার ধরন শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

 

কিন্তু শুধু সংখ্যা জানলেই তো দায়িত্ব শেষ হয় না।

একজন শ্রবণপ্রতিবন্ধী মানুষ হাসপাতালে গেলে কীভাবে চিকিৎসককে নিজের সমস্যার কথা বলবেন? থানায় গেলে কীভাবে অভিযোগ করবেন? আদালতে গেলে কীভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরবেন?

 

দুর্যোগের সময় টেলিভিশনে জরুরি খবর প্রচার হলে তিনি কীভাবে তা বুঝবেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের খুঁজতে হবে। কারণ অধিকার কেবল কাগজে থাকলেই হয় না; সেই অধিকার বাস্তবে ভোগ করার সুযোগও নিশ্চিত করতে হয়।

 

আমরা কী করতে পারি?

সব দায়িত্ব সরকারের নয়। আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে।

আমরা চাইলে সাংকেতিক ভাষার কিছু সাধারণ সংকেত শিখতে পারি। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন সংগঠন সাংকেতিক ভাষা শেখানোর ছোট কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। শিক্ষকেরা ক্লাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লিখে দিতে পারেন। অনলাইন ভিডিওতে ক্যাপশন দেওয়া যেতে পারে। অনুষ্ঠান ও সভায় প্রয়োজন অনুযায়ী সাংকেতিক ভাষার দোভাষী রাখা যেতে পারে।

 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে মিশতে হবে।

 

তাঁদের দেখে অবাক হওয়ার দরকার নেই। করুণা করারও দরকার নেই। তাঁরা আমাদের মতোই মানুষ। তাঁদের প্রয়োজন সম্মান, মর্যাদা ও সমান সুযোগ।

 

বাংলাদেশ আরও কী করতে পারে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। বধির শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও দোভাষীর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

 

হাসপাতাল, পুলিশ, আদালত ও সরকারি অফিসে যোগাযোগের সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ও সরকারি ঘোষণায় ক্যাপশন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাংকেতিক ভাষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিশেষ করে দুর্যোগের সময় এ ধরনের ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

কর্মক্ষেত্রেও যোগাযোগের বাধা কমাতে হবে। কারণ একজন মানুষ শুনতে পান না বলে তাঁর যোগ্যতা কমে যায় না।

 

তাঁদের সমাজের অংশ করব কীভাবে?

সমাজের অংশ করা মানে তাঁদের আলাদা করে রাখা নয়; বরং সমাজের প্রতিটি জায়গাকে তাঁদের জন্যও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা।

 

তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিজের প্রতিভা প্রকাশ করবেন। চাকরি করবেন। হাসপাতালে নিজের কথা বলতে পারবেন। সরকারি তথ্য বুঝতে পারবেন। নিজের মতামত প্রকাশ করবেন।

 

আর তাঁদের নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাঁদের কথাও শুনতে হবে। কারণ তাঁদের কী প্রয়োজন, সেটা আমরা সবসময় বাইরে থেকে বুঝতে পারব না। তাঁদের কাছ থেকেই জানতে হবে।

 

শেষ কথাটা আমাদের জন্য

আন্তর্জাতিক সাংকেতিক ভাষা দিবস শুধু একটি দিবস নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যোগাযোগের অধিকারও মানুষের অধিকার।

 

আমরা যদি একজন মানুষকে পড়াশোনার সুযোগ দিই, কিন্তু তাঁর ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ না দিই, তাহলে সেই সুযোগ কতটা কাজে আসবে?

 

আমরা যদি তাঁকে চাকরি দিই, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা না রাখি, তাহলে তিনি কীভাবে নিজের যোগ্যতা দেখাবেন?

 

আমরা যদি বলি সবাই সমান, কিন্তু তাঁর ভাষা বুঝতে চেষ্টাই না করি, তাহলে সেই সমতার অর্থ কী?

 

আমাদের সবাইকে সাংকেতিক ভাষা বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। কিন্তু অন্তত এমন একটি সমাজ তৈরি করতে হবে, যেখানে ভাষা আলাদা হওয়ার কারণে কোনো মানুষ একা হয়ে না পড়েন।

 

কারণ মানুষ শুধু মুখ দিয়ে কথা বলেন না।

কেউ শব্দ দিয়ে কথা বলেন, কেউ হাত দিয়ে। কেউ কণ্ঠ দিয়ে কথা বলেন, কেউ চোখের ইশারায়। ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের অধিকার আলাদা হতে পারে না।

 

তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত নয়—

“সে আমাদের ভাষা বোঝে কি না?”

প্রশ্নটা হওয়া উচিত—

“আমরা কি তার ভাষা বোঝার চেষ্টা করেছি?”

 

 

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted