গালিবা আনতারা সোয়ারা
বর্তমানে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস, রুচি ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন ঘটছে। প্রতিনিয়ত আমরা যেন কোনো এক অচেনা, অদৃশ্য ছায়ার পেছনে ছুটে চলেছি। আমাদের মন যেন কোনো এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে। আগের তুলনায় মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও পাঠরুচিতে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সহজেই লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সমকালীন জনপ্রিয় বই পড়ার আগ্রহ বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, উনিশ ও বিশ শতকের অনেক সাহিত্যকর্মের প্রতি তাদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। কেন এমন হচ্ছে? আমরা কি ধীরে ধীরে বই পড়ার আনন্দ হারিয়ে ফেলছি, নাকি আনন্দ খোঁজার ধরনটাই বদলে যাচ্ছে?
বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে পদ্মজাসহ বিভিন্ন জনপ্রিয় উপন্যাস, প্রেমের গল্প, আবেগনির্ভর কাহিনি এবং সম্পর্ককেন্দ্রিক বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখা যায়। এসব বইয়ের চরিত্র, প্রেম, আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা নানা ঘটনা সহজেই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে। পাঠকেরা অল্প সময়ের মধ্যেই গল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কখনো কোনো চরিত্রের দুঃখে মন খারাপ হয়, কখনো তার আনন্দে আনন্দিত হয়, আবার কখনো গল্পের পরিণতি জানার আগ্রহে একের পর এক পৃষ্ঠা পড়ে যায়। অর্থাৎ, এসব বইয়ের কাহিনি ও চরিত্রের মধ্যে তারা সহজেই আনন্দ খুঁজে পায়। এ কারণে বইগুলো পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহও বেশি থাকে।
অন্যদিকে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গৃহদাহ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাঁসুলী বাঁকের উপকথা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিচিত্র প্রবন্ধ কিংবা মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য পড়ার ক্ষেত্রে অনেকেই ততটা আগ্রহ অনুভব করে না। এসব বইয়ের বিষয়বস্তু বুঝতে, চরিত্রের মনস্তত্ত্ব উপলব্ধি করতে কিংবা লেখকের বক্তব্যের গভীরে যেতে কিছুটা সময় ও মনোযোগের প্রয়োজন হয়। কোথাও ভাষা কঠিন মনে হয়, কোথাও কাহিনির গতি ধীর, আবার কোথাও তৎকালীন সমাজ ও জীবন সম্পর্কে ধারণা না থাকলে বিষয়বস্তু বুঝতে অসুবিধা হয়। ফলে অনেকের কাছে এসব বই পড়া আনন্দের চেয়ে বেশি পরিশ্রমের কাজ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই বইগুলোতে এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা আমাদের চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করতে পারে। আরণ্যক পড়লে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, বনজীবন এবং সভ্যতার বিস্তারে প্রকৃতির পরিবর্তনের চিত্র সামনে আসে। হাঁসুলী বাঁকের উপকথা আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে। গৃহদাহ পড়লে মানুষের সম্পর্ক, ত্রিকোণ প্রেম এবং মানসিক দ্বন্দ্বের নানা দিক বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের বিচিত্র প্রবন্ধ আমাদের জীবন ও সমাজ নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। অন্যদিকে, মেঘনাদবধ কাব্য বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কাব্যজগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। অর্থাৎ, এসব বই কেবল গল্প বলে না; গল্পের আড়ালে থাকা জীবন, সমাজ, মানুষ ও সময়কেও চিনতে সাহায্য করে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা কেন এসব বই পড়তে গিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি? এর একটি কারণ হতে পারে, আমরা এখন দ্রুত আনন্দ পেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের একটি বড় অংশ দখল করে আছে। বিশেষ করে রিলসের মতো ছোট ভিডিও অল্প সময়েই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও শেষ হতে না হতেই সামনে চলে আসে আরেকটি ভিডিও। এভাবে খুব অল্প সময়ে আমরা অনেক কিছু দেখে ফেলি। কিন্তু সেসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ কতটুকু পাই?
বই পড়ার ক্ষেত্রেও কি আমরা একই রকম অভ্যাস তৈরি করছি? যে বই অল্প সময়ে পড়ে শেষ করা যায়, যার কাহিনি সহজে বোঝা যায় এবং যা দ্রুত আনন্দ দেয়, সেটিই কি আমাদের বেশি আকৃষ্ট করছে? দুই শ পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস পড়ে তার চরিত্র, সমাজ ও জীবনদর্শন বুঝতে যে সময় ও মনোযোগ দিতে হয়, তার তুলনায় কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও দেখা অনেক সহজ। ফলে সহজে আনন্দ পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি বই পড়া অনেকের কাছে কঠিন মনে হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, বর্তমান প্রজন্ম বই পড়তে চায় না। বরং তাদের আগ্রহের ধরন বদলেছে। তারা এমন বইয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছে, যেগুলোর সঙ্গে দ্রুত সংযোগ তৈরি করা যায়।
আরেকটি বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় বই পড়াকে শুধু আনন্দ পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখি। যে বই পড়ে দ্রুত আনন্দ পাওয়া যায়, সেটিকে আপন করে নিই; আর যে বই বুঝতে একটু সময় লাগে, সেটি থেকে দূরে সরে যাই। অথচ সব বইয়ের আনন্দ এক রকম নয়। কিছু বই পড়ে আমরা তাৎক্ষণিক আনন্দ পাই, আবার কিছু বই পড়তে পড়তে ধীরে ধীরে নতুন চিন্তার জগতে প্রবেশ করি। কোনো বই আমাদের হাসায়, কোনো বই কাঁদায়, আবার কোনো বই আমাদের এমন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, যেগুলোর উত্তর খুঁজতে দীর্ঘ সময় লাগে।
ধ্রুপদি সাহিত্য পড়ার আনন্দ অনেক সময় বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছানোর পরও থেকে যায়। একটি চরিত্রের সিদ্ধান্ত, একটি ঘটনার পরিণতি কিংবা লেখকের কোনো বক্তব্য আমাদের দীর্ঘদিন ভাবাতে পারে। কিন্তু সেই আনন্দ পেতে হলে বইটির সঙ্গে সময় কাটাতে হয়। ধৈর্য ধরে পড়তে হয়, বুঝতে চেষ্টা করতে হয় এবং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়। আমরা যদি শুরুতেই কোনো বইকে কঠিন বা বিরক্তিকর মনে করে দূরে সরিয়ে রাখি, তাহলে সেই বইয়ের ভেতরে থাকা আনন্দ ও উপলব্ধির সুযোগটিও হারিয়ে ফেলি।
তবে এখানে সমকালীন বইকে ছোট করে দেখার কোনো কারণ নেই। নতুন লেখকদের বই পড়া, নতুন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা সমসাময়িক মানুষের চিন্তাভাবনা বোঝার জন্য এসব বইয়েরও গুরুত্ব রয়েছে। প্রত্যেক পাঠকের রুচি এক রকম হবে না, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমকালীন বই পড়ার পাশাপাশি পুরোনো সাহিত্যকর্মের প্রতিও আগ্রহ তৈরি করা প্রয়োজন। কারণ, নতুন বই আমাদের বর্তমান সময়ের কথা বলে, আর পুরোনো সাহিত্য আমাদের অতীতের মানুষ, সমাজ ও জীবনকে চিনতে সাহায্য করে। দুইয়ের মধ্যেই রয়েছে শেখার ও আনন্দ পাওয়ার সুযোগ। আমরা যদি বই পড়ার অভ্যাসকে কেবল দ্রুত আনন্দ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে দীর্ঘ সাহিত্যকর্মের প্রতি আমাদের ধৈর্য কমে যেতে পারে। তাই বই পড়ার আনন্দকে একটু বিস্তৃত করা দরকার। শুধু সহজে বোঝা যায় কিংবা দ্রুত শেষ করা যায়—এমন বই নয়, বরং যেসব বই আমাদের ভাবায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, সেগুলোকেও পাঠের তালিকায় রাখা উচিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে, আমরা কতগুলো বই পড়ছি; বরং প্রশ্ন হলো, বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা কতটা ভাবছি, কতটা শিখছি এবং নিজেদের চিন্তার জগৎকে কতটা সমৃদ্ধ করছি। আমরা কি কেবল কয়েক মুহূর্তের আনন্দ খুঁজছি, নাকি এমন আনন্দও খুঁজছি, যা দীর্ঘদিন আমাদের ভাবনার মধ্যে বেঁচে থাকবে? সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচি বদলাবে, বইয়ের ধরন বদলাবে, পাঠের মাধ্যমও বদলাবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ভিড়ে যেন গভীরভাবে পড়ার অভ্যাসটি হারিয়ে না যায়। কারণ, বই পড়া মানে শুধু একটি গল্পের শেষ জানা নয়; কখনো কখনো বই পড়া মানে নিজের অজানা জগৎকে চিনে নেওয়া।বইয়ের পাতা যেন শুধু সময় কাটানোর মাধ্যম না হয়ে ওঠে, বরং হয়ে উঠুক চিন্তার জানালা—যে জানালা দিয়ে আমরা নিজেদের, সমাজকে এবং পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে শিখব।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
















