কলম্বিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহত ১৩০

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 

কলম্বিয়ায় ৭.৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৮৭ জন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহরে ভবন ধসে পড়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছেন।

 

সোমবার পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ভূমিকম্পে কালি, পেরেইরা, কিবদো ও মানিজালেসসহ বেশ কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হয়েছে।

 

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীতে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকায় ভূমিকম্পটির উৎপত্তি। এর গভীরতা ছিল প্রায় ১০৭ কিলোমিটার। মূল কম্পনের পর কয়েক ঘণ্টায় অন্তত ২১টি পরাঘাত অনুভূত হয়েছে।

 

ধ্বংসস্তূপে চলছে উদ্ধার

দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালি ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও কাজ করছেন।

 

স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে অন্তত ২০টি ভবন পুরোপুরি বা আংশিক ধসে পড়েছে। আরও প্রায় ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

৬৪ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক জর্জে মনকায়ো বলেন, ভবন ধসের সময় শহরের বিভিন্ন অংশ থেকে ধুলার মেঘ উঠতে দেখেছেন তিনি।

 

স্থানীয় বাসিন্দা হুয়ান কার্লোস ওসোরিও একটি ভবন ধসের শব্দকে বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি জানান, আশপাশের মানুষ নিজেরাই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তবে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালাতে ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন।

 

জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা

ভূমিকম্পের ভয়াবহতার পর জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা। দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নতুন সরকারের সামনে বড় ধরনের এই দুর্যোগ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

 

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন রক্ষা এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকারের সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

সরকারের প্রাথমিক হিসাবে, রিসারালদা অঞ্চলে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। ওই অঞ্চলের রাজধানী পেরেইরায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং বিভিন্ন স্থানে উদ্ধার অভিযান চলছে।

 

ভাল্যে দেল কাওকা অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত ২৭ জন। নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে বলে জানা গেছে।

 

অন্যদিকে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি চোকো অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো পরিস্থিতির তথ্য সংগ্রহে সময় লাগছে। অঞ্চলটির গভর্নর নুবিয়া ক্যারোলিনা কর্দোবা জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত ১২ জন নিহত ও ৮৪ জন আহত হয়েছেন। এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

 

নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজছেন স্বজনরা

ভূমিকম্পের পর নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহে বিভিন্ন ডিজিটাল ডেটাবেসে নাম নিবন্ধন শুরু হয়েছে। সোমবার বিকেল পর্যন্ত একটি ডেটাবেসে ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষের তথ্য যুক্ত হয়। তাদের অধিকাংশই কালি ও পেরেইরা এলাকার বাসিন্দা।

 

পেরেইরা বিমানবন্দরের ছাদের একটি অংশ ধসে পড়ার ভিডিও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আতঙ্কিত যাত্রীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

 

শহরটির মেয়র মরিসিও সালাজার জানান, পেরেইরায় অন্তত ১৫টি ভবন ধসে পড়েছে। এসব স্থাপনার ভেতরে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

মানিজালেসেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে একটি ঐতিহাসিক নব্য-গথিক ক্যাথেড্রালের পাশের একটি টাওয়ার ধসে পড়ে। এতে আশপাশের সড়কে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

 

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পরিদর্শন ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য পশ্চিমাঞ্চলের পেরেইরা, মানিজালেস, কিবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরাসহ কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

 

শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পন

প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’ অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কলম্বিয়ায় মাঝেমধ্যে ভূমিকম্প হলেও শক্তিশালী কম্পন তুলনামূলকভাবে বিরল।

 

১৯৯৯ সালে আর্মেনিয়া শহরের কাছে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্পে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।

 

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা বলছে, সোমবারের ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি ২১ শতকে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।

 

নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ভূকম্পবিদ সুজান ভ্যান ডার লি বলেন, ভূমিকম্পের তীব্রতা, উৎপত্তির অবস্থান এবং ভূত্বকের গঠনের কারণে জনবহুল উপত্যকাগুলোতে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

 

আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রস্তাব

দুর্যোগের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি আশ্রয়, খাদ্য এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ১৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণা করেছে।

 

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ওয়াশিংটন কলম্বিয়ার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

 

এল সালভাদর ও মেক্সিকোও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে জানান, উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসক, প্যারামেডিক এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠাতে তাঁর দেশ প্রস্তুত।

 

চিলির প্রেসিডেন্ট হোসে আন্তোনিও কাস্তও কলম্বিয়াকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। এ ছাড়া ইসরায়েল, ইকুয়েডর ও ফ্রান্সও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছে।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted