দুই বছর পরও থমকে রাষ্ট্র সংস্কার, নতুন পথে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশ, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা এবং জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের পর সংবিধান সংস্কারের জন্য যে প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটিও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

 

এর পরিবর্তে বর্তমান বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে নতুন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দল শুরুতেই এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের দাবি সামনে আসে। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি সরকারের অন্যতম প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে।

 

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও পুলিশ সংস্কারে ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়।

 

পরবর্তী সময়ে শ্রম, নারী ও গণমাধ্যমবিষয়ক আরও তিনটি কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশন বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে সংস্কারের সুপারিশ তৈরি করে।

 

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির জন্য ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। প্রায় আট মাসের আলোচনার পর ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে প্রণয়ন করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এতে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব ছিল সংবিধান সংশ্লিষ্ট।

 

জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ নির্ধারণে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

 

এর ভিত্তিতে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল।

 

বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সদস্যদের সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। শপথের এক মাসের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন আহ্বান এবং প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ ও গণভোটের ফলাফলের আলোকে সংবিধান সংস্কারের বিধান রাখা হয়েছিল।

 

তবে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা সেই শপথ নেননি। ফলে সংস্কার পরিষদ কার্যকরভাবে গঠিত হয়নি।

 

বিএনপির অবস্থান ছিল, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ এবং সংসদ সদস্যদের এ ধরনের অতিরিক্ত শপথ নেওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ নেই। তবে দলটি সনদে স্বাক্ষর করা বিষয়গুলো নিজেদের অবস্থান ও ভিন্নমত অনুযায়ী বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে।

 

সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদ ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে এই কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।

 

কমিটির দায়িত্ব হলো সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনের বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়া।

 

গত মঙ্গলবার কমিটি প্রথম বৈঠক করেছে। সেখানে জুলাই জাতীয় সনদের পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

 

কমিটি পুরো সংবিধান পর্যালোচনার পাশাপাশি সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, পেশাজীবী, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

 

তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই কমিটি কি জুলাই জাতীয় সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ তৈরি করবে, নাকি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে ভিত্তি করে নতুন করে সংশোধনের সুপারিশ দেবে।

 

জুলাই জাতীয় সনদের বেশ কিছু প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপির অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব ক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে সংবিধানে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

 

উদাহরণ হিসেবে উচ্চকক্ষের কথা বলা হচ্ছে। জুলাই সনদে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনে নিম্নকক্ষে একটি দল সারা দেশে যত ভোট পাবে, তার অনুপাতে আসন বণ্টনের প্রস্তাব রয়েছে।

 

অন্যদিকে বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে নিম্নকক্ষে পাওয়া আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টনের কথা বলেছে।

 

এ ছাড়া সংবিধান সংশোধনী বিলের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের ক্ষমতা নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। জুলাই সনদে নিম্নকক্ষে পাস হওয়া সংশোধনী বিল উচ্চকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদনের সুযোগ রাখার কথা বলা হলেও বিএনপি উচ্চকক্ষকে এমন ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে নয়।

 

শুধু সংবিধান নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার উদ্যোগেরও কিছু অংশ থেমে গেছে।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ ১১০টি অনুমোদন করেছে। সাতটি অধ্যাদেশ বাতিল হয়েছে এবং ১৬টি বিল হিসেবে সংসদে উত্থাপিত না হওয়ায় কার্যকারিতা হারিয়েছে।

 

কার্যকারিতা হারানো অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত ও গোপন অনুসন্ধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করা এবং পুলিশ কমিশন গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

 

এপ্রিল মাসে সরকার জানিয়েছিল, এসব বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী আইন করা হবে। তবে এখনো সেসব বিল সংসদে উত্থাপিত হয়নি।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন পরিবর্তন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নতুন কাঠামো দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ সংসদ অনুমোদন না করায় কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদত্যাগ করেন। এখনো কমিশনটি পুনর্গঠন করা হয়নি।

 

সম্প্রতি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের একটি খসড়া প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে করা অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এ দায়িত্ব দেওয়ার কথা ছিল। এ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

 

অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বেশ কিছু অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, সরকারি চাকরি, সাইবার সুরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ফৌজদারি কার্যবিধি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্কার রয়েছে।

 

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার সুযোগ তৈরি করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন এনে কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচার করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

 

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দায়মুক্তির বিষয়েও পৃথক অধ্যাদেশ অনুমোদন পেয়েছে।

 

তবে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের সংশোধনীসহ কিছু বিষয়ে বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করে আইন পাসের অভিযোগ রয়েছে। একটি সংশোধনীর মাধ্যমে পুরোনো ব্যাংক মালিকদের ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে সমালোচনা ওঠে। পরে সরকার ওই বিধান বাদ দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

 

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবের সঙ্গে বিএনপি একমত, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকারগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

 

তিনি বলেন, এর বাইরে যেসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, সেসব নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

 

সরকারের দাবি, সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয় সংসদের অনুমোদনের মাধ্যমেই করতে হবে। তাই বিশেষ কমিটি সুপারিশ তৈরি করে সংসদে প্রতিবেদন দেবে এবং পরবর্তী সময়ে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া এগোবে।

 

তবে সংস্কারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একাংশ মনে করছেন, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পূরণ করতে হলে শুধু আইন সংশোধন যথেষ্ট নয়। সংবিধান, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

 

দুই বছর পরও সেই মৌলিক সংস্কারের বড় অংশ বাস্তবায়িত না হওয়ায় রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted