বেসরকারি চাকরিতে পে স্কেল চাই

174 বার পঠিত

মামুন হোসেন আগুন

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি আজ বেসরকারি খাত। শিল্প, ওষুধ, ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি, গার্মেন্টস, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি উৎপাদন ও সেবামূলক খাতে কর্মসংস্থানের সিংহভাগ সৃষ্টি করছে এই খাত। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনও একটি স্বচ্ছ, মানসম্মত ও ন্যায্য পে স্কেল বা বেতন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে একই ধরনের কাজ, একই যোগ্যতা এবং একই দায়িত্ব পালন করেও কর্মীরা ভিন্ন ভিন্ন বেতন পাচ্ছেন। এটি শুধু আর্থিক বৈষম্য নয়, এটি কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতার প্রশ্নও।

 

পে স্কেল বলতে কেবল মাসিক বেতনের পরিমাণ বোঝায় না। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ পারিশ্রমিক কাঠামো, যেখানে প্রতিটি পদের জন্য নির্ধারিত বেতনসীমা, গ্রেড, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতির পর বেতন বৃদ্ধি, বিভিন্ন ভাতা, উৎসব বোনাস, কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক প্রণোদনা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, অবসর-পরবর্তী সুবিধা এবং অন্যান্য আর্থিক নীতিমালা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে। অর্থাৎ, একজন কর্মীর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থানের একটি স্পষ্ট রূপরেখাই হলো পে স্কেল।

সরকারি চাকরিতে এই কাঠামো বহুদিন ধরেই প্রতিষ্ঠিত। একজন কর্মচারী চাকরিতে যোগদানের আগেই জানেন তিনি কোন গ্রেডে থাকবেন, কত বেতন পাবেন, কত বছর পর ইনক্রিমেন্ট হবে এবং পদোন্নতির পর তাঁর আর্থিক অবস্থান কোথায় পৌঁছাবে। ফলে সেখানে একটি পূর্বানুমানযোগ্যতা, স্বচ্ছতা এবং নিরাপত্তা কাজ করে। কিন্তু বেসরকারি খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে এই নিশ্চয়তা অনুপস্থিত। অনেক ক্ষেত্রে বেতন নির্ধারণ হয় ব্যক্তিগত দর-কষাকষি, ব্যবস্থাপনার ইচ্ছা কিংবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অস্বচ্ছ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। এতে একই প্রতিষ্ঠানের একই পদে কর্মরত দুই ব্যক্তির বেতনে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়, যা কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করে।

 

একটি স্বচ্ছ পে স্কেল কেবল কর্মীদের জন্যই নয়, প্রতিষ্ঠানের জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যখন একজন কর্মী জানেন তাঁর কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সময়ের ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধি নিশ্চিত হবে, তখন তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি পায়। কর্মী অকারণে চাকরি পরিবর্তন করতে চান না, দক্ষ জনবল দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানে থাকে এবং নতুন কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যয়ও কমে আসে। অন্যদিকে, অস্বচ্ছ বেতন কাঠামো দক্ষ কর্মীদের নিরুৎসাহিত করে, কর্মী ছেড়ে যাওয়ার হার বাড়ায় এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

 

আজকের বিশ্বে মানবসম্পদকে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক করপোরেট ব্যবস্থাপনায় তাই বেতনকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। যে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ন্যায্য মূল্যায়ন করে, তাদের জন্য নির্ধারিত ক্যারিয়ার পথ তৈরি করে এবং স্বচ্ছ পারিশ্রমিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে, সেই প্রতিষ্ঠানই দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক মানের বহু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এ ধরনের নীতির সুফল পাচ্ছে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতও সেই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।

 

বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহনের খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কর্মীরা যদি না জানেন তাঁদের বেতন কীভাবে বাড়বে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক চাপে ভোগেন, যা শেষ পর্যন্ত কর্মক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। একটি নির্ধারিত পে স্কেল এই অনিশ্চয়তা অনেকাংশে দূর করতে পারে এবং কর্মীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করতে পারে।

 

তবে পে স্কেল মানেই সব প্রতিষ্ঠানে একই বেতন—এমন ধারণা সঠিক নয়। প্রতিষ্ঠানের আকার, আর্থিক সক্ষমতা, শিল্পখাত ও ব্যবসার ধরন ভেদে বেতন ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে সমান যোগ্যতা ও সমমানের দায়িত্বে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য একটি নির্ধারিত, যৌক্তিক ও স্বচ্ছ কাঠামো থাকা জরুরি। এখানেই পে স্কেলের প্রকৃত গুরুত্ব।

 

একটি আধুনিক বেসরকারি পে স্কেলে অন্তত কয়েকটি বিষয় বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত—পদভিত্তিক গ্রেড, সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনসীমা, নিয়মিত বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের স্বচ্ছ পদ্ধতি, পদোন্নতির স্পষ্ট নীতিমালা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যবীমা, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন সুবিধা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় অন্তর বেতন পুনর্বিবেচনার ব্যবস্থা।

 

সরকারেরও এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বজায় রেখেই সরকার খাতভিত্তিক ন্যূনতম বেতন কাঠামো, স্বচ্ছ বেতননীতি এবং নিয়মিত বেতন পর্যালোচনার নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে পারে। একই সঙ্গে শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন এবং বৈষম্যবিরোধী নীতির ওপর নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন কর্মীদের অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে সুশাসন ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশও শক্তিশালী হবে।

 

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটি উচ্চতর অর্থনৈতিক অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই অগ্রযাত্রা কেবল অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্যতা, মর্যাদা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি খাতের লাখো কর্মী দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—সবারই দায়িত্ব।

 

বেসরকারি চাকরিতে একটি স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক পে স্কেল চালু করা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি। ন্যায্য পারিশ্রমিক কেবল একজন কর্মীর জীবনমান উন্নত করে না, বরং একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা, স্থিতিশীলতা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করে। তাই উন্নত কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে বেসরকারি খাতে পে স্কেল প্রবর্তনের বিষয়টি আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই।

 

রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিভাগ, ঢাকা কলেজ

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted