প্লাস্টিক দূষণে হুমকির মুখে নদী ও জীববৈচিত্র্য

সাকিবুল হাছান

 

  • দেশে বছরে ৯.৭৭ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে
  • প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৭০% ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যাচ্ছে
  • ঢাকায় মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার ২২.২৫ কেজি
  • ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ হয়
  • ঢাকার প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৩৭.২% পুনর্ব্যবহার করা হয়

            তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংক (World Bank), জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)

 

বাংলাদেশের নদীগুলো দিন দিন প্লাস্টিক বর্জ্যের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন নগর, শিল্পাঞ্চল ও জনবসতি থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল, খাদ্যপণ্যের মোড়ক ও অন্যান্য বর্জ্য খাল, নালা ও ড্রেনের মাধ্যমে নদীতে গিয়ে মিশছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে জলজ প্রাণী, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র, নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্য।

 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর প্রায় ৭০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আসে না। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ খোলা স্থানে পড়ে থাকে, পুড়িয়ে ফেলা হয় কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে নদী, খাল ও জলাশয়ে পৌঁছে যায়। দ্রুত নগরায়ন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের নদীগুলো ক্রমেই প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিতে পড়ছে।

 

বাংলাদেশে জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও নগরায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারের পরিমাণ ২০০৫ সালের প্রায় ৩ কেজি থেকে বেড়ে ২০২০ সালে প্রায় ৯ কেজিতে দাঁড়িয়েছে।

 

রাজধানী ঢাকায় এই ব্যবহার আরও বেশি, যেখানে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২২ দশমিক ২৫ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করে। বাজার, খাদ্য সরবরাহ, অনলাইন বাণিজ্য ও প্যাকেজিং খাতে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও এর মাত্র প্রায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়, বাকিটা পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

 

বাকি অংশের একটি বড় অংশ বিভিন্নভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির পানি, নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং খালগুলোর মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত নদীতে গিয়ে জমা হয়।

রাজধানীর চারপাশের নদী—বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা—দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের দূষণের চাপ মোকাবিলা করছে। শিল্পবর্জ্যের পাশাপাশি কঠিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক এখন এসব নদীর অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে।

 

নদীতে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করার পাশাপাশি জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এসব বর্জ্যের কারণে নদীর তলদেশে দূষণের স্তর তৈরি হচ্ছে, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং মাছ, কচ্ছপ ও পাখিসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী প্লাস্টিক গ্রহণ করে ক্ষতির মুখে পড়ছে। দীর্ঘ সময় পর প্লাস্টিক ক্ষুদ্র কণায় বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে, যা খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।

 

প্লাস্টিক দূষণের প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের নদীগুলো মৎস্যসম্পদ, কৃষি, নৌপরিবহন ও মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নদীর পরিবেশ নষ্ট হলে মাছের উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর প্রভাব পড়ে জেলে সম্প্রদায় এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। এছাড়া নদী ও খালে প্লাস্টিক জমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ে।

 

বাংলাদেশে প্লাস্টিক দূষণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহার অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। ব্যবহারের পর বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি না হওয়ায় তা খাল, ড্রেন ও নদীতে গিয়ে জমা হচ্ছে। পাশাপাশি বর্জ্য পৃথকীকরণের অভাব, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে প্লাস্টিক দূষণ দিন দিন আরও বাড়ছে।

 

প্লাস্টিক দূষণ কমাতে শুধু নদী পরিষ্কার কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে শুরু করে ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমানো, পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার শুরুতেই প্লাস্টিক আলাদা করার ব্যবস্থা চালু করা গেলে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধে নজরদারি বৃদ্ধি, শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং প্লাস্টিক উৎপাদন ও ব্যবহারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

 

প্লাস্টিক দূষণ কমাতে নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, বাজারে পাট বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার, ব্যবহৃত প্লাস্টিক নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন। পাশাপাশি নদী, খাল ও জলাশয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য না ফেলা এবং আশপাশের মানুষকে সচেতন করার মাধ্যমেও দূষণ কমানোর উদ্যোগকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।

 

বাংলাদেশের নদীগুলো দেশের অর্থনীতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান প্লাস্টিক দূষণ এই প্রাকৃতিক সম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

দেশে বছরে প্রায় ৯ লাখ ৭৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন এবং এর বড় অংশ ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকার বিষয়টি পরিস্থিতির গভীরতা তুলে ধরে। এখনই কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্লাস্টিক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে নদী ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted