চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আজকের চট্টগ্রাম সফর ঘিরে নানা কর্মসূচি থাকলেও সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে তাঁর সৌজন্য সাক্ষাৎ। রাজনৈতিক অঙ্গনে এই বৈঠককে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীকে ঘিরে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বিএনপি ও হেফাজতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ হিসেবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।
রোববার (৯ আগস্ট) দিনব্যাপী চট্টগ্রাম সফরে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। সফরের অংশ হিসেবে তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম দেখবেন এবং দলীয় একটি কর্মসূচিতেও অংশ নেবেন।
তবে এসব কর্মসূচির বাইরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় তাঁর যাওয়া। সেখানে দুপুর ২টার দিকে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবরও জিয়ারত করবেন।
মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানাবে হেফাজত
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখনো চলমান মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়টি তুলে ধরবেন সংগঠনটির আমির। পাশাপাশি ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে হেফাজতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কওমি মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রমে সরকারের সহযোগিতার প্রত্যাশার কথাও জানানো হতে পারে।
হেফাজতের দাবি অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে বিভিন্ন ঘটনায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশ মামলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার এসব মামলার একটি বড় অংশ প্রত্যাহার করে। পরে বিএনপি সরকার আমলেও কিছু মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় দায়ের হওয়া বেশ কিছু মামলা এখনো বহাল রয়েছে। হাটহাজারী, মুন্সীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় দায়ের হওয়া দুই ডজনের বেশি মামলা এখনো প্রত্যাহার হয়নি বলে হেফাজতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকে ‘নতুন ইতিহাস’ বলছে হেফাজত
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী শুধু সংগঠনটির আমির নন, তিনি দেশের একজন প্রবীণ আলেম ও মুরব্বি। তাঁর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে হেফাজত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়টি যেমন আলোচনায় আসবে, তেমনি ধর্মীয় ইস্যুতে সংগঠনটির অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও উঠে আসতে পারে।
জামায়াতবিরোধী অবস্থানই কি বিএনপির কৌশল?
হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে আদর্শিক দূরত্ব দীর্ঘদিনের। দেওবন্দি চিন্তাধারার হেফাজত মওদুদী মতাদর্শের জামায়াতের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই বিরোধিতাকে বিএনপি নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাতে চাইছে—এমন আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের আগে হেফাজত প্রকাশ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। একই সময়ে সংগঠনটির আমির জামায়াতকে ভোট দেওয়ার বিরোধিতা করেন। নির্বাচনের পরও জামায়াতবিরোধী অবস্থানে অনড় রয়েছে হেফাজত।
এমনকি হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা কয়েকজন নেতা জামায়াতের জোটে যাওয়ার পর সংগঠনের ভেতরে তাঁদের ভূমিকা সীমিত করা হয়। এসব ঘটনাকে বিএনপি ও হেফাজতের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি নজরে রেখেছে জামায়াতে ইসলামীও। গত নির্বাচনে ফটিকছড়ি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যক্ষ নুরুল আমিন মনে করেন, হেফাজতের জামায়াতবিরোধী অবস্থানের পেছনে আদর্শিক কারণ থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও জড়িত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, বিএনপি হেফাজতের এই অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারে—এটি অস্বাভাবিক নয়। তবে হেফাজতের পক্ষ থেকে জামায়াতের যেসব সমালোচনা করা হয়, সেগুলো তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন বলেও জানান তিনি।
তাঁর প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে জামায়াত ও হেফাজতের মধ্যকার দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে আসবে।
চট্টগ্রাম জামায়াতের এক সিনিয়র নেতা অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক হেফাজতের কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে অর্থের প্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ায় সংগঠনটি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইতে পারে। বিএনপিও সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক কৌশলে ব্যবহার করছে বলে তাঁর দাবি।
সম্পর্কের পেছনে আন্দোলনের ভূমিকা দেখছে বিএনপি
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান অবশ্য জামায়াতকে চাপে রাখার অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ তারই ধারাবাহিকতা।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও হেফাজত একসঙ্গে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং নির্বাচনের সময়ও হেফাজত বিএনপিকে সমর্থন করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হেফাজত আমিরের সাক্ষাৎকে অন্য কোনো রাজনৈতিক অর্থে দেখার কারণ নেই।
২০১৩ থেকেই বিএনপি-হেফাজত ঘনিষ্ঠতা
হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে ১৩ দফা দাবিতে বড় সমাবেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও অভিযানের ঘটনা ঘটে।
সে সময় বিএনপির পক্ষ থেকে হেফাজতের কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানানো হয়। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের কারণে হেফাজতের একটি অংশ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ তৈরি করেছিল। তবে বর্তমানে সেই অংশের বড় একটি অংশ সক্রিয় নয়।
এখন বিএনপি সরকারে থাকা অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নিজে হেফাজতের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছেন। ফলে এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নাকি এর পেছনে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে—তা নিয়েই রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।


















