ক্যান্সারের বাড়তি চাপ, বছরে নতুন রোগী ১.৬৭ লাখ

সাকিবুল হাছান

 

বছরে নতুন ক্যান্সার রোগী: ১ লাখ ৬৭ হাজার

বছরে ক্যান্সারজনিত মৃত্যু: ১ লাখ ১৬ হাজার

৫ বছরের মধ্যে ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছেন: ৩ লাখ ৪৬ হাজার

দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১২%–এর সঙ্গে ক্যান্সারের সম্পর্ক

প্রায় ৪৬% ক্যান্সার কেসের সঙ্গে তামাক–সম্পর্কিত ঝুঁকি

প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত —৪৫৮

প্রতিদিন মৃত্যু — ৩১৯

 

একসময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল সংক্রামক রোগ। ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ মোকাবিলা করা ছিল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের আয়ু বেড়েছে, নগরায়ন ত্বরান্বিত হয়েছে, আমাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে, সেই সাথে বেড়েছে অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হয়ে উঠেছে ক্যান্সার।

 

আন্তর্জাতিক ক্যান্সার পর্যবেক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন ক্যান্সার রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। একই সময়ে ক্যান্সারজনিত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষের। গত পাঁচ বছর প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার মানুষ ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছেন অর্থাৎ চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪৫৮ জন নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং প্রতিদিন ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন প্রায় ৩১৯ জন। দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের সাথে ক্যান্সারের সম্পর্ক রয়েছে। সোর্স : International Agency for Research on Cancer (IARC). Global Cancer Observatory (GLOBOCAN) – Bangladesh Fact Sheet, 2022. WHO Cancer Agency.

 

এগুলো শুধু রোগীর সংখ্যা নয় বরং ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তে থাকা চাপেরও ইঙ্গিত। তুলনামূলক তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে ক্যান্সার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নতুন রোগী প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে ক্যান্সারজনিত মৃত্যুও বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে শুধু রোগ বৃদ্ধিই দায়ী নয়। দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের দীর্ঘায়ু, উন্নত পরীক্ষা–নিরীক্ষা এবং আগে অশনাক্ত থাকা রোগ এখন শনাক্ত হওয়াও বড় কারণ। তবে এটাও সত্য যে বাস্তবে ঝুঁকি বাড়ছে।

বাংলাদেশে এখনও ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধযোগ্য কারণ হচ্ছে তামাক। গবেষণা বলছে, দেশের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি ক্যান্সার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তামাকের সম্পর্ক রয়েছে। এর বাইরে দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণ, কম শারীরিক পরিশ্রম, অতিরিক্ত ওজন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, কম ঘুম এবং কিছু ভাইরাস সংক্রমণও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

 

চিকিৎসকেরা বলছেন, আগে যেসব মৃত্যু “অজানা” থেকে যেত এখন তার একটি অংশ পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যান্সার হিসেবে ধরা পড়ছে। ফলে রোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি শনাক্তও বেশি হচ্ছে। বাংলাদেশে ক্যান্সারের ধরন নারী ও পুরুষভেদে ভিন্ন। পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায় ফুসফুস, মুখগহ্বর এবং খাদ্যনালির ক্যান্সার। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় স্তন ক্যান্সারকে দেশে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারের অন্যতম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

একটি নতুন উদ্বেগ হলো-রোগীর বয়সের ধরণও বদলাচ্ছে। ক্যান্সার এখন শুধু বয়স্কদের রোগ নয়; কর্মক্ষম বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রোগী বাড়ছে। যদিও সব ধরনের ক্যান্সার তরুণদের মধ্যে দ্রুত বাড়ছে-এমন প্রমাণ নেই, কিন্তু তরুণ রোগীদের উপস্থিতি এখন বেশি দৃশ্যমান। এর পেছনে রয়েছে বেশি স্ক্রিনিং, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্থূলতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোগের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো-রোগ দেরিতে শনাক্ত হওয়া। চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক রোগী তখন হাসপাতালে আসেন যখন রোগ দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, চিকিৎসা দীর্ঘ হয় এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দীর্ঘদিন কাশি, অকারণ ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক রক্তপাত, শরীরে গুটি, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা ক্লান্তির মতো উপসর্গকে অনেক সময় গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

 

চিকিৎসা অবকাঠামোও এখনও বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। গত কয়েক বছরে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ক্যান্সার চিকিৎসা বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দেশে ক্যান্সার নির্ণয়, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং কিছু ক্ষেত্রে টার্গেটেড ও ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-উন্নত চিকিৎসার বড় অংশ এখনও রাজধানীকেন্দ্রিক। জেলা পর্যায়ের রোগীদের উল্লেখযোগ্য অংশকে ঢাকায় বা বিভাগীয় শহরে যেতে হয়।

 

রোগীর জন্য চিকিৎসা মানে শুধু হাসপাতালের বিছানা নয়-যাতায়াত, থাকার খরচ, পরিবারের একজনের কর্মবিরতি, পুনঃপরীক্ষা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যয়ও বহু পরিবারের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতা। রোগ ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী ব্যয় কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ব্যয়বহুল চিকিৎসা যেমন টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যায়।

 

স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ এখনও রোগীকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে ক্যান্সার আক্রান্ত বহু পরিবার আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দশকের জন্য এখনই প্রস্তুতি না নিলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। তাদের মতে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত-তামাক নিয়ন্ত্রণ, জেলা পর্যায়ে ক্যান্সারসেবা সম্প্রসারণ, স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাড়ানো, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি, স্বাস্থ্যবিমা ও আর্থিক সুরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ক্যান্সার রেজিস্ট্রি উন্নত করা। কারণ ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতালের দায়িত্ব নয়। এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থারও পরীক্ষা।

 

ক্যান্সার মানেই মৃত্যু-এই ধারণা আজ আর পুরোপুরি সত্য নয়। আধুনিক চিকিৎসায় অনেক ক্যান্সার নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময়ও সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন সময়মতো শনাক্তকরণ, চিকিৎসা শুরু, চিকিৎসা সম্পন্ন করার সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা। প্রশ্ন এখন একটাই-বাংলাদেশে রোগীর চাপ যেভাবে বাড়ছে, সেই গতিতে কি প্রস্তুত হচ্ছে স্বাস্থ্যব্যবস্থা?

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted