শিক্ষা প্রতিবেদক
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে নতুন রেকর্ড হয়েছে। নির্ধারিত সাত দিনে ৪ লাখ ২৫১ জন শিক্ষার্থী ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি বিষয়ে খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে। গত বছরের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ বেশি।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী গড়ে তিনটি বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছে। এমনকি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও ফল আরও ভালো করার আশায় খাতা চ্যালেঞ্জ করেছে।
গত ১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ২২ হাজারের বেশি কমেছে।
কেন এত আবেদন
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এবার খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগের নিয়মে সাধারণত নম্বর যোগে ভুল, কোনো উত্তরের নম্বর বাদ পড়া কিংবা নম্বর গণনায় ত্রুটি হয়েছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হতো। পুরো উত্তরপত্র নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ ছিল না।
তবে চলতি বছর পাবলিক পরীক্ষা সংক্রান্ত আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় খাতা চ্যালেঞ্জ করা হলে পুরো উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের কথা জানানো হয়েছে। এ কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে আবেদন করার আগ্রহ বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর পাশাপাশি এবারের পরীক্ষায় তুলনামূলক কঠোর মূল্যায়ন, পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়া এবং আগের মতো অতিরিক্ত বা সহানুভূতিশীল নম্বর না দেওয়াও আবেদনের সংখ্যা বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি আবেদন
বোর্ডভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন জমা পড়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এই বোর্ডে তত্ত্বীয় বিষয়ে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ৫৮ হাজার ১২টি—মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৭টি আবেদন হয়েছে।
চট্টগ্রাম বোর্ডে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০১টি, রাজশাহীতে ১ লাখ ২২ হাজার ২২৮টি, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৯টি, কুমিল্লায় ১ লাখ ১২ হাজার ৬১১টি এবং দিনাজপুরে ১ লাখ ১১ হাজার ২৬০টি আবেদন পড়েছে।
এ ছাড়া যশোর বোর্ডে ৯১ হাজার ৫৯টি, ময়মনসিংহে ৮৭ হাজার ১৫৭টি, বরিশালে ৬১ হাজার ৮৬টি, সিলেটে ৬০ হাজার ৯৭৪টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫১ হাজার ২১৪টি আবেদন জমা হয়েছে।
ইংরেজি ও গণিতে বেশি আগ্রহ
পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে ইংরেজি ও গণিতের মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তত্ত্বীয় বিষয়ে করা আবেদনের মধ্যে ইংরেজিতে প্রায় ৪৬ হাজার এবং গণিতে প্রায় ৩৪ হাজার আবেদন রয়েছে।
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশার তুলনায় কম নম্বর পাওয়ায় পুনরায় উত্তরপত্র যাচাইয়ের সুযোগ নিয়েছে। তবে আবেদন বেশি হওয়া মানেই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
নতুন পদ্ধতিতে দ্রুত ফল প্রকাশের আশা
আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আকতারুজ্জামান বলেন, প্রচলিত পুনর্নিরীক্ষণ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে নতুন ব্যবস্থায় উত্তরপত্র মূল্যায়নের কারণেই এবার আবেদনের সংখ্যা এত বেড়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আবেদন করা খাতাগুলো যাচাই করে ফল প্রকাশের আশা করছেন তিনি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহছানুল কবিরের মতে, পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের অধিকার। আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া, অল্প নম্বরে অকৃতকার্য হওয়া কিংবা গ্রেড পরিবর্তনের প্রত্যাশাও আবেদনের সংখ্যা বাড়িয়েছে।
নতুন নিয়মে পুরো উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়ন হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফল পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন তিনি। এখন বিপুলসংখ্যক আবেদন নির্ধারিত সময়ে কীভাবে যাচাই করা হবে, সেটিই শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
















