ইয়েমেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের কৌশল কী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 

ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এখন এমন এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেখানে কোনো পক্ষই পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে পারছে না। বরং প্রতিটি পক্ষই প্রতিপক্ষকে দুর্বল রাখার পাশাপাশি এমন একটি ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যাতে কোনো এক শক্তি পুরো দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে।

 

বিশ্লেষক শাদি ইব্রাহিমের মতে, ইয়েমেনের পরিস্থিতি মার্কিন কৌশলবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াকের ‘গিভ ওয়ার আ চান্স’ তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ধারণা অনুযায়ী, সব যুদ্ধের সমাপ্তি যে শান্তি নিশ্চিত করবে, তা নয়; কখনো কখনো কোনো পক্ষকে পুরোপুরি জয়ী হতে না দেওয়াই বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

 

২০১৫ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখলের পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে। তাদের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও হুতিদের পুরোপুরি পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে হুতিরাও পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।

 

২০২২ সালের মধ্যে যুদ্ধের প্রধান ফ্রন্টগুলো অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ এখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে যুদ্ধ থামলেও রাজনৈতিক সমাধান হয়নি।

 

হুতিদের পতনেও ঝুঁকি

হুতিদের পূর্ণ বিজয় সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ ইয়েমেনের দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে ইরানঘনিষ্ঠ একটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর স্থায়ী উপস্থিতি রিয়াদের জন্য উদ্বেগের কারণ।

 

একই সঙ্গে বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

 

অন্যদিকে হুতিদের পুরোপুরি নির্মূল করাও সহজ নয়। তারা শুধু ইরানের সমর্থন পাওয়া একটি গোষ্ঠী নয়; ইয়েমেনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও উপজাতীয় কাঠামোর সঙ্গেও তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

 

ফলে হুতিদের পতনের পর ক্ষমতার শূন্যতা কে পূরণ করবে—এ প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত-সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি সক্রিয় রয়েছে।

ওয়াশিংটনের দ্বৈত নীতি

২০১৫ সালের পর ইয়েমেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতেও নানা সময়ে পরিবর্তন দেখা গেছে। কখনো ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে, আবার কখনো সেই সমর্থন কমিয়েছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাও করেছে।

 

২০২৫ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত লোহিত সাগরে জাহাজে হুতিদের হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান জোরদার করে। পরে ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলে যুক্তরাষ্ট্রও হামলা থামায়।

 

এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য সবসময় হুতি শাসনের পতন বা ইয়েমেন যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান ছিল না। বরং নির্দিষ্ট কিছু আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই অনেক সময় অগ্রাধিকার পেয়েছে।

 

গাজার যুদ্ধের পর নতুন মাত্রা

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিদের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা ইয়েমেনের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারলেও লোহিত সাগর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা দেখিয়েছে।

 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারও পুরো দেশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ‘বিজয়’ শব্দটির অর্থই অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিটি পক্ষই কিছু সুবিধা ধরে রেখেছে—হুতিদের হাতে সানা ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ, সরকারের হাতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সৌদি আরবের জন্য হুতিদের পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ঠেকিয়ে রাখা এবং ইরানের জন্য আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি মাধ্যম।

 

তবে এই ভারসাম্য অত্যন্ত ভঙ্গুর। হুতিদের পূর্ণ বিজয় যেমন সৌদি আরবের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াবে, তেমনি তাদের পুরোপুরি নির্মূল করতে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের প্রয়োজন হতে পারে। আবার ইয়েমেনকে বিভক্ত করার চেষ্টা নতুন সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

 

আঞ্চলিক শক্তির নতুন সমীকরণ

ইয়েমেন সংকটের সঙ্গে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যও জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ভরতার ওপর থাকতে চাইছে না; তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে।

 

তবে এই উদীয়মান তুরস্ক–সৌদি–পাকিস্তান সমীকরণকে এখনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট বলা যায় না। বরং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় বিকল্প অংশীদারিত্ব তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্যও আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তার বোঝা ভাগ করে নেওয়া একেবারে অস্বস্তিকর নয়। এতে ওয়াশিংটনের সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমানো সম্ভব হয়।

 

সব মিলিয়ে ইয়েমেনের সংকট এখন শুধু হুতি ও সরকারের মধ্যকার যুদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থ। আর এই বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে যুদ্ধ থেমে গেলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনিশ্চিত।

 

মূল কথা হলো—ইয়েমেনে কোনো পক্ষের পূর্ণ বিজয় হয়তো অন্য পক্ষগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে সংঘাতকে পুরোপুরি শেষ করার বদলে নিয়ন্ত্রিত অচলাবস্থাই অনেক শক্তির কাছে বেশি সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।

 

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted