নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহের লক্ষ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চারটি এলএনজি কার্গো নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগস্টে এসব কার্গো দেশে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সোমবার পর্যন্ত একটিও আসেনি। সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়ও এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো।
এ অবস্থায় গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র দুটি কার্গোর জন্য দরপত্রে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। বাকি তিনটির জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়নি।
পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা কার্গোগুলো সময়মতো না আসায় গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
আগস্টের শুরুতে ছয়টি এলএনজি কার্গো সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল থেকে দুটি, ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি থেকে দুটি এবং হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানি থেকে দুটি কার্গো কেনার কথা ছিল।
চুক্তি অনুযায়ী ব্ল্যাককিউবের একটি কার্গো আগস্টে এবং একটি সেপ্টেম্বরে, ম্যাক্সওয়েলের একটি আগস্টে ও একটি অক্টোবরে এবং ঝেনইউর দুটি কার্গো আগস্টে আসার কথা।
তবে এখন পর্যন্ত সরাসরি কেনা চারটি আগস্টের কার্গোর কোনোটি দেশে পৌঁছায়নি।
এর মধ্যে ঝেনইউ শিপিংয়ের একটি জাহাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, প্রস্তাবিত জাহাজটি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে জটিলতার আশঙ্কায় বাংলাদেশ জাহাজটি গ্রহণ করেনি।
অন্য কার্গোগুলোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত হয়নি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহের অনুমতি চাইতে পারে বলে জানা গেছে।
সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা এলএনজির দাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ২২ ডলার। অথচ ব্ল্যাককিউব ১৫ দশমিক ৫০ ডলার এবং ঝেনইউ ১৪ দশমিক ৯৫ ডলারে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাজারদরের তুলনায় এত কম দরে প্রস্তাব আসার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, কার্গোর উৎস এবং জাহাজের বিষয়ে আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।
তাদের মতে, নির্ধারিত সময়ে সরবরাহ না করে পরে বাজারদর পরিবর্তনের সুযোগ পেলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লাভবান হতে পারে। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো সরবরাহ করতে ব্যর্থ হলে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।
সরাসরি কেনা কার্গোগুলোর অনিশ্চয়তার মধ্যে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে সরবরাহের জন্য নতুন করে পাঁচটি কার্গো কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২৩-২৪ আগস্ট এবং ৪-৫ সেপ্টেম্বর সরবরাহের জন্য দুটি কার্গোর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। প্রতি এমএমবিটিইউর দাম প্রায় ২২ ডলার।
তবে বাকি তিনটি কার্গোর জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়নি। ফলে এসব কার্গোর জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করতে হতে পারে।
বাংলাদেশ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক খোলাবাজার থেকে এলএনজি আমদানি করে। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি সরকারি পর্যায়ের একটি চুক্তিও রয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালও বর্তমানে সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট।
গত ২১ জুলাই অগ্নিকাণ্ডের পর এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে সামিটের টার্মিনাল পুরোপুরি এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। তবে নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ কমতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত নতুন কার্গো না এলে ওই টার্মিনাল থেকেও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ গত কয়েক দিনে ওঠানামা করেছে। শুক্রবার বিকেলে সরবরাহ দৈনিক ১৬৪ কোটি ঘনফুটে নেমে গেলেও শনিবার রাতে তা বেড়ে ২৪২ কোটিতে ওঠে। এরপর রোববার ২৪০ কোটি এবং সোমবার ২২৮ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। সোমবার এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হয় প্রায় ৬৬ কোটি ঘনফুট।
গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়ায় নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও হবিগঞ্জের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনে ফিরতে শুরু করলেও সব এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
গাজীপুরের কিছু এলাকায় এখনো গ্যাসের চাপ কম রয়েছে। সাভারের একটি স্পিনিং মিল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ পাওয়া যাচ্ছে না।
শিল্প উদ্যোক্তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয় এবং কারখানার পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সরাসরি ক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা। সেই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠান সময়মতো এলএনজি সরবরাহ করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত দরপত্রের মাধ্যমে নতুন কার্গো সংগ্রহ করে গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
















