গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট বহুমুখী, দ্রুত সমাধানের তাগিদ

অনলাইন ডেস্ক

 

দেশে দীর্ঘদিন ধরে কমছে গ্যাসের উৎপাদন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম। গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশে দিনে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

 

একই সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ভর্তুকির পাশাপাশি বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ বাড়ছে। সব মিলিয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সংকট।

 

তবে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাঁদের মতে, সাময়িকভাবে বাড়তি ব্যয় করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গেলে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল থাকলে সরকারের রাজস্বও বাড়তে পারে।

 

আগামী নভেম্বর থেকে তাপমাত্রা কমতে শুরু করলে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর—এই দুই মাসকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

 

ব্যবসায়ীদের পরামর্শ, এ সময়ে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালিয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমানো যেতে পারে। তাঁদের মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে এলএনজি আমদানির তুলনায় তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হতে পারে।

 

সরকারও তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, তেলচালিত কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়াতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

 

সাম্প্রতিক সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে আমদানিনির্ভরতাকে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে।

 

গত বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৭১টি এলএনজি কার্গো এলেও চলতি বছরে এসেছে ৬৮টি। জুলাই ও আগস্টে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ছয়টি কার্গো কম এসেছে। এর মধ্যে একটি এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের কারণে ১৬ দিন গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবও পড়েছে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারে। কাতার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়েছে। ফলে খোলাবাজার থেকে এলএনজি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গরম খুব একটা কমবে না। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দুই মাসে অন্তত ২০টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

 

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি কার্গো ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। চারটি আসবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, আর চারটি কেনা হয়েছে খোলাবাজার থেকে।

 

খোলাবাজারে এলএনজির দাম প্রতি ইউনিট প্রায় ২২ থেকে ২৪ দশমিক ৬২ ডলারের মধ্যে রয়েছে। আরও দুটি কার্গো কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলেও একটিতে ২৬ ডলারের দর পাওয়া গেছে এবং অন্যটিতে কোনো দরদাতা পাওয়া যায়নি। পরে ওই দুটি কার্গোর জন্য আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় পেশাজীবী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। তাদের মাধ্যমে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজির দাম বেশি হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী তা আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি তেল ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়িয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে হবে। অগ্রাধিকারভিত্তিতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted