বিশ্ব মানবিক দিবস : মানবিকতার আয়নায় আজকের পৃথিবী

৪৬ বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা

 

 

এক হাতে শান্তির সনদ, অন্য হাতে যুদ্ধের অস্ত্র—এ কেমন মানবসভ্যতা? মানুষ চাঁদে পৌঁছে গেছে, মানুষ মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করছে, ভবিষ্যৎ বদলাতে প্রতিনিয়ত কাজ করছে, চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খুলছে। অথচ একই পৃথিবীতে লাখো মানুষ আজ নিরাপদ আশ্রয়, একবেলা খাবার কিংবা চিকিৎসার অপেক্ষায়। কেউ ঘর হারাচ্ছে, কেউ ক্ষুধার্ত হচ্ছে, সন্তানকে হারাচ্ছে কিংবা সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে একটু নিরাপদ ভাবে বেচেঁ থাকতে । তাহলে প্রশ্ন জাগে, সভ্যতার  কাছে আমরা যতটা এগিয়েছি, মানবিকতার দিক থেকে কি ততটাই এগিয়েছি?

 

প্রতিবছর ১৯ ই আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব মানবিক দিবস। এই দিবসে অন্যতম উদ্দেশ্য সংকট ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং মানবিক সহায়তাকর্মীদের অবদান ও নিরাপত্তাকে সামনে আনা । দিবসটির পেছনে রয়েছে ২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট বাগদাদে জাতিসংঘের Canal Hotel-এ ভয়াবহ হামলার স্মৃতি। ওই ঘটনায় ২২ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে ছিলেন ইরাকে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি সার্জিও ভিয়েইরা দে মেলো। পাঁচ বছর পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।তাহলে এই দিবস কি শুধু মানবিক কর্মীদের স্মরণ করলেই দায়িত্ব শেষ? না, বরং এটি প্রশ্ন রাখে আমরা কতটা মানবিক হতে পেরেছি?

 

যুদ্ধ থামে না, মানুষের দুর্ভোগও থামে না। জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৫ সালে ৭২টি দেশে ৩০৫.১ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। অর্থাৎ বিশ্বের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এমন পরিস্থিতির মধ্যে ছিল, যেখানে বেঁচে থাকা, নিরাপত্তা ও মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই বাইরের সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে। এটি সাময়িক সময়ের জন্য মনে হতে পারে একটি পরিসংখ্যান কিংবা জরিপ কিন্তু এখানে প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি শিশু, একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন।

 

আজ বিশ্ব মানবিকতার এক কঠিন পরীক্ষার নাম গাজা। দীর্ঘ সংঘাতে অসংখ্য মানুষ ঘর হারিয়েছে একইসাথে  স্বাভাবিক জীবন হারিয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত। স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটও তীব্র।

২০২৬ সালের আগস্টেও গাজায় হামলা ও গোলাবর্ষণ অব্যাহত থাকার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘ। এতে বেসামরিক মানুষও হতাহত হচ্ছেন। ইসরায়েলের নিরাপত্তা কিংবা ফিলিস্তিনিদের অধিকার—এসব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু মানবিকতার প্রশ্নটি সহজ—যুদ্ধের কারণ যাই হোক, সাধারণ মানুষের জীবন কি নিরাপদ থাকার অধিকার রাখে না?

কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। মানুষের পরিচয়ের আগে তার জীবন।

 

সুদানের পরিস্থিতি দেখলে মানবিকতার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালে জাতিসংঘ জানিয়েছে, দেশটির প্রায় ৩৪ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। যুদ্ধের কারণে প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ নিজ দেশেই ঘরছাড়া হয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে আরেক ভয়াবহ সংকট ক্ষুধা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মে মাসে সুদানের প্রায় ১৯. ৫ মিলিয়ন মানুষ তীব্র খাদ্যসংকট ছিল। ১৪ টি এলাকায় তৈরি হয়েছিল দু্র্ভিক্ষের আশঙ্কা।

 

তাহলে একটি যুদ্ধ কেবল মানুষের ঘর কেড়ে নিচ্ছে না বরং মানুষের শান্তি, খাবার, চিকিৎসা ও স্বাভাবিকভাবে বেচেঁ থাকার অধিকার ও।বোমার শব্দ একদিন হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু একটি শিশুর ঘরে যদি খাবার না থাকে, হাসপাতালের দরজা বন্ধ, স্কুলে যাওয়ার পথ হারিয়ে যদি যায় তাহলে মানবিকের জায়গাটা কোথায়?   যুদ্ধ থামলেই কি মানুষের কষ্ট থামে?

 

মিয়ানমারে বছরের পর বছর চলা সংঘাতে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেক পরিবার খাবার, চিকিৎসা, ও নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমারের সংকট হয়তো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আগের মতো জায়গা পাইনা।কিন্তু মানুষের কষ্ট চলমান।

 

ইউক্রেন: যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া

ইউক্রেনে বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব পড়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ ও জীবিকার ওপর। একটি শিশুর কাছে যুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক হিসাব নয়। তার কাছে যুদ্ধ মানে—স্কুল বন্ধ, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, পরিবার থেকে দূরে থাকা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। আর যারা এই সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ান—চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক ও মানবিক কর্মীরা—তাদের জীবনও ঝুঁকির বাইরে নয়।

যারা অন্যকে বাঁচাতে ছুটে যান, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে কে?

 

তাহলে কি পৃথিবী অমানবিক হয়ে গেছে?

না। এখানেই গল্পের অন্য দিকটি আছে। যুদ্ধের মধ্যেও চিকিৎসকরা রোগীর পাশে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার পৌঁছে দেন। মানবিক কর্মীরা বিপদের মধ্যে কাজ করেন। অপরিচিত মানুষ অপরিচিত মানুষের জন্য আশ্রয়ের দরজা খুলে দেন। অর্থাৎ মানবিকতা এখনও বেঁচে আছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ব্যক্তির মানবিকতার সঙ্গে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার রাজনীতি সবসময় একই পথে হাঁটে না। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো অন্যের কষ্ট দেখে কাঁদেন। কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে সেই একই মানুষের জীবন কখনো কখনো পরিণত হয় একটি পরিসংখ্যানে।সেখানেই মানবিকতার সবচেয়ে বড় সংকট।

 

আসুন আমরা মানবিক হয়। একে অপরের পাশে দাড়াই।

 

 

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ,

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted