বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: ১৬ সেকেন্ডের হাসির আড়ালে

12 বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা

 

“আত্মহত্যা”—শব্দটি কখনো খেয়াল করেছেন? শব্দটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ‘নিজেকে হত্যা’ করার নির্মম অর্থ। কিন্তু কখনো কি আমরা একটু থেমে ভেবে দেখেছি—কেন একজন মানুষ নিজের জীবন নিয়ে এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা ভাবতে বাধ্য হয়? চারপাশে এত মানুষের ভিড়, পরিবার, বন্ধু, সহপাঠী, পরিচিত মুখ—তবুও কেন কেউ নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করে? কেন তার মনে হয়, তার কথা শোনার মতো কেউ নেই, তার কষ্ট বোঝার মতো কেউ নেই? অনেক সময় মানুষটি হয়তো সাহায্য চাইতে চেয়েছিল, কিন্তু তার নীরবতাকে আমরা অভিমান ভেবেছি। হয়তো সে বলতে চেয়েছিল, “আমি ভালো নেই”—কিন্তু আমরা ব্যস্ততার অজুহাতে তার কথাটা শুনিনি।

 

তাই শুধু একজন মানুষ কেন এমন সিদ্ধান্ত নেয়, সেই প্রশ্ন না করে আমাদের ভাবা উচিত—তার কষ্টের সময়ে আমরা কোথায় ছিলাম? হয়তো একটু মন দিয়ে শোনা, একটু পাশে থাকা, কিংবা শুধু বলা—“তুমি একা নও, তোমার কথা আমি শুনতে চাই”—কখনো কখনো একজন মানুষের জন্য অনেক বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

 

১৬ সেকেন্ডের রিলস কি একজন মানুষের পুরো জীবন?

আজকাল কাউকে চিনতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগে না। একটা রিলস দেখলাম, একটা ছবি দেখলাম, কয়েকটা স্টোরি দেখলাম—ব্যস, মনে হলো মানুষটাকে বুঝে ফেলেছি। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরছে, হাসছে, গান করছে। কেউ সুন্দর একটা ছবি দিচ্ছে। কেউ আবার রিলসে এমনভাবে হাসছে, দেখে মনে হবে তার জীবনে কোনো দুঃখই নেই।

 

আমরা দেখে বলে দিই, “ও তো বেশ ভালোই আছে!” কিন্তু সত্যিই কি তাই? একটা রিলস হয়তো ১৬ সেকেন্ডের। অথচ একজন মানুষের দিন ২৪ ঘণ্টার। এই ১৬ সেকেন্ডে আমরা তার হাসিটা দেখি, কিন্তু বাকি সময়টা দেখি না। দেখি না রাতে ঘুমানোর আগে তার কী চিন্তা হয়। দেখি না একা ঘরে বসে সে কী নিয়ে ভাবছে। দেখি না পরিবারের সামনে হাসিমুখে থাকা মানুষটি নিজের ভেতরে কতটা ক্লান্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা সাধারণত জীবনের সুন্দর অংশটাই দেখাই। মন খারাপের দিন, ভয়, ব্যর্থতা, অনিশ্চয়তা কিংবা একাকিত্ব—এসব খুব কমই প্রকাশ করি। তাই স্ক্রিনে কাউকে হাসতে দেখেই ধরে নেওয়া যাবে না যে সে ভেতর থেকেও ভালো আছে। এত কিছু থাকার পরও মানুষ কেন একা?

 

আজ মানুষের হাতে স্মার্টফোন আছে, ইন্টারনেট আছে, হাজার হাজার পরিচিত মানুষ আছে। কথা বলতে চাইলে মুহূর্তেই কাউকে মেসেজ দেওয়া যায়। তারপরও কেন এত একাকিত্ব?  কারণ যোগাযোগ বেড়েছে, কিন্তু সবসময় মনের যোগাযোগ বাড়েনি। একজন মানুষের ফোনে শত শত নম্বর থাকতে পারে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বন্ধু থাকতে পারে; তবু এমন একজন মানুষ নাও থাকতে পারে, যার কাছে সে নির্ভয়ে বলতে পারে—“আমি ভালো নেই।”কেউ কেউ নিজের কষ্ট ভুলে থাকতে সারাক্ষণ ফোনে থাকে। কেউ নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কেউ ধূমপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কেউ আবার সারাক্ষণ হাসি-ঠাট্টার মধ্যে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু এসবের কোনোটিই ভেতরের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।

 

তাহলে প্রশ্নটা থেকেই যায়—এত মানুষ, এত ব্যস্ততা, এত বিনোদন, এত যোগাযোগের পরও কেন কেউ নিজের জীবন নিয়ে এত গভীর সংকটে পড়ে?

 

এর উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। পৃথিবীর ছবিটাও খুব স্বস্তির নয়।আত্মহত্যা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০২৫ সালের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৭ লাখ ২৭ হাজার মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। একই বছরে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ ছিল আত্মহত্যা। আর বিশ্বে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর প্রায় ৭৩ শতাংশ ঘটেছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। সংখ্যাগুলো পড়লে হয়তো আমরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যাই। কিন্তু একটু ভাবুন—৭ লাখ ২৭ হাজার কোনো সাধারণ সংখ্যা নয় বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ ছিল। ছিল তার পরিবার, সম্পর্ক, স্বপ্ন, ভালোবাসার মানুষ এবং একটি ভবিষ্যৎ।আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো মানুষ কেন এমন সংকটে পৌঁছায়, তার একটিমাত্র উত্তর নেই। WHO বলছে, মানসিক ও সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক চাপ, একাকিত্ব, জীবনের বড় কোনো সংকটসহ নানা বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।অর্থাৎ বাইরে থেকে কাউকে দেখে তার ভেতরের গল্পটা আমরা পুরোপুরি জানি না বাংলাদেশের মানুষও কি ভালো আছে? বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভাবার মতো।

 

WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বোঝা বড়। দেশে ৬০ লাখের বেশি মানুষ বিষণ্নতাজনিত সমস্যায় এবং প্রায় ৭০ লাখ মানুষ উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভুগছেন—এমন হিসাব WHO-এর দেশভিত্তিক তথ্যের মধ্যে রয়েছে। তবে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঠিক বর্তমান চিত্র বোঝা কঠিন। কারণ দেশে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বা বেসরকারি সংগঠনের জরিপে পাওয়া সংখ্যাকে সরাসরি সরকারি জাতীয় পরিসংখ্যান বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে তথ্যের ঘাটতি থাকলেই সমস্যাটি ছোট হয়ে যায় না।

 

বরং প্রশ্নটা আরও জরুরি হয়ে ওঠে—যারা কষ্টের মধ্যে আছে, তাদের আমরা কতটা দেখতে পাচ্ছি? বাংলাদেশে আত্মহত্যা ও আত্মক্ষতি নিয়ে পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বোঝা এবং প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্য WHO LIVE LIFE উদ্যোগের আওতায় কাজ করছে। অর্থাৎ বিষয়টি এখন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে নয়, জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তরুণদের কথাও একটু শুনি

 

আমাদের চারপাশে এমন অনেক তরুণ আছে, যাদের জীবন বাইরে থেকে একদম স্বাভাবিক মনে হয়। ক্লাস করছে।বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে।পরীক্ষা দিচ্ছে। ফেসবুকে পোস্ট দিচ্ছে, রিলস বানাচ্ছে।হাসছে।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে হয়তো সে পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ, পরিবার, অর্থনৈতিক চাপ কিংবা সম্পর্কের কোনো সমস্যায় ভুগছে। আমরা তখন খুব সহজ কিছু কথা বলে ফেলি—

“এত চিন্তা করছ কেন?”

“একটা পরীক্ষায় খারাপ হয়েছে, আবার দিও।”

“এসব তো জীবনেরই অংশ।”

কথাগুলো ভুল নয়। কিন্তু সমস্যায় থাকা মানুষটির তখন হয়তো উপদেশের চেয়ে বেশি দরকার একজন শ্রোতা।

তার দরকার এমন একজন, যে বলবে— “তুমি বলো, আমি শুনছি।”হাসিমুখ মানেই ভালো থাকা নয়।আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে—মানুষ কাঁদলে বুঝি সে কষ্টে আছে। কিন্তু সব কষ্ট চোখের পানি হয়ে বের হয় না।কেউ কষ্ট পেয়েও হাসতে পারে।কেউ মন খারাপ নিয়েও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারে।কেউ ভেতরে অস্থির থেকেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দর ছবি দিতে পারে। তাই কারও হাসিকে তার ভালো থাকার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

 

কাছের কারও আচরণে বড় পরিবর্তন দেখলে তাকে এড়িয়ে না গিয়ে একটু কথা বলা দরকার। সে যদি নিজেকে গুটিয়ে নেয়, খুব বেশি একা থাকতে চায় কিংবা বারবার বলে যে সে ভালো নেই—তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সব সমস্যার সমাধান হয়তো আমাদের জানা নেই। কিন্তু আমরা তাকে একা না রেখে বিশ্বস্ত পরিবার, শিক্ষক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারি।আমাদের কথাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ কখনো কখনো আমরা মজা করে এমন কিছু কথা বলে ফেলি, যা অন্য একজনের মনে অনেক গভীরভাবে আঘাত করতে পারে।কারও ফলাফল নিয়ে হাসাহাসি করি।কারও চেহারা নিয়ে মন্তব্য করি।কারও পারিবারিক অবস্থা নিয়ে কথা বলি।কারও ব্যর্থতাকে অন্যের সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করি।

 

আমরা হয়তো পাঁচ মিনিট পর কথাটা ভুলে যাই। কিন্তু যে শুনেছে, সে হয়তো অনেক দিন মনে রাখে।তাই একটু ভেবে কথা বলা দরকার। কারণ আমরা জানি না, আমাদের বলা একটি কথার সময় সেই মানুষটি জীবনের কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

 

পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পাশে দাঁড়াক একজন সন্তান যেন বাবা-মায়ের কাছে নিজের ব্যর্থতার কথা বলতে ভয় না পায়।একজন শিক্ষার্থী যেন শিক্ষককে বলতে পারে, “আমি মানসিকভাবে খুব চাপে আছি।” একজন বন্ধু যেন বন্ধুকে বলতে পারে, “তোর সঙ্গে একটু বসব?”এই ছোট ছোট জায়গাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলাকে লজ্জার বিষয় না বানিয়ে স্বাভাবিক করতে হবে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।

আর গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। আত্মহত্যার কোনো ঘটনাকে চাঞ্চল্যকরভাবে তুলে ধরার বদলে কীভাবে মানুষকে সাহায্য করা যায়, কীভাবে সচেতনতা বাড়ানো যায়—সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। WHO-ও আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশে দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেয়। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা আমাদেরইআমরা মানুষের ১৬ সেকেন্ডের রিলস দেখি। তার হাসি দেখি।তার সুন্দর ছবি দেখি।বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ দেখি। কিন্তু তার জীবনের বাকি সময়টা দেখি না। তাই কাউকে দেখে খুব সহজে বলে দেব না—“ও তো ভালোই আছে।”

 

বরং মাঝে মাঝে একটু থেমে জিজ্ঞেস করি—“সত্যি করে বলো তো, কেমন আছ?”হয়তো সে প্রথমবার বলবে না। আবার জিজ্ঞেস করতে হতে পারে। তবু জিজ্ঞেস করি। কারণ কখনো কখনো মানুষ সমাধান খুঁজে পাওয়ার আগেই একজন শ্রোতা খোঁজে।

 

আমরা যেন শুধু কারও হাসির ছবিতে ‘লাইক’ দিতে না শিখি; তার নীরবতাটাও শুনতে শিখি।

১৬ সেকেন্ডের একটি রিলস একজন মানুষের পুরো জীবন নয়।স্ক্রিনের হাসির আড়ালেও একজন মানুষ আছে—তার ভয় আছে, কষ্ট আছে, স্বপ্ন আছে, না-বলা কথা আছে। তাই মানুষের বিচার করার আগে মানুষটাকে বোঝার চেষ্টা করি।

 

ভিড়ের মধ্যে মানুষ অনেক পাওয়া যায়। কিন্তু এমন একজন মানুষ হওয়া জরুরি, যার কাছে অন্য কেউ নিজের কষ্ট নিয়ে নির্ভয়ে ফিরে আসতে পারে।

 

 

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

 গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted