কানন ইসলাম
ধরুন, সকাল আটটা। আপনাকে সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে পৌঁছাতে হবে। একজন নিম্নবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত মানুষ হিসেবে প্রথমেই আপনি গণপরিবহনের কথা ভাববেন। কিন্তু বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভিড়, অনিশ্চিত সময়সূচি কিংবা গন্তব্য পর্যন্ত সরাসরি পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত হয়তো রিকশাই আপনার প্রথম পছন্দ হয়ে উঠবে। বাসা থেকে বের হয়েই রিকশা পাওয়া যায়, অপেক্ষা করতে হয় না, আর গন্তব্যের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া যায়। এভাবেই রিকশা ধীরে ধীরে ঢাকাবাসীর প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
একদিকে রিকশা যানজট ও নগর ব্যবস্থাপনার একটি আলোচিত বিষয়, অন্যদিকে এটি লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে রিকশা নিয়ে আলোচনা নতুন করে তীব্র হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—ঢাকায় এত রিকশা কেন? মানুষ কেন রিকশার ওপর এত নির্ভরশীল? আর রিকশার সংখ্যা কমিয়ে দিলে এর বিকল্পই বা কী হবে?
বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট হলেও ব্যাটারিচালিত রিকশার বড় একটি অংশের নির্ভরযোগ্য নিবন্ধন-তথ্য না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ঢাকায় সক্রিয় রিকশার সংখ্যা প্রায় ১২ থেকে ২২ লাখের মধ্যে হতে পারে। এর মধ্যে নিবন্ধিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার। ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট—রিকশা শুধু একটি যানবাহন নয়; এটি ঢাকার অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দৈনন্দিন জীবনব্যবস্থার একটি বড় অংশ।
ঢাকায় এত রিকশা থাকার অন্যতম প্রধান কারণ কার্যকর গণপরিবহনের ঘাটতি। ঢাকা মহানগরে বিভিন্ন রুটে হাজার হাজার বাস চলাচল করলেও বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় তা এখনো অপ্রতুল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাসের অনিয়মিত চলাচল, অতিরিক্ত ভিড়, অস্বস্তিকর পরিবেশ এবং দীর্ঘ সময় অপেক্ষার সমস্যা। একজন কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে চান না। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়েই বিকল্প হিসেবে রিকশা বেছে নেন। অর্থাৎ রিকশার বিস্তার শুধু মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দের ফল নয়; এটি অনেকাংশে দুর্বল ও অপর্যাপ্ত গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া।
রিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো বেকার কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে শহরে আসা নিম্নআয়ের মানুষের জন্য দ্রুত কোনো কাজ পাওয়ার সুযোগ সীমিত। রিকশা চালানো তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য হওয়ায় বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে এই পেশায় যুক্ত হন। তাই রিকশার সংখ্যা কমানোর আলোচনা শুধু যানবাহন কমানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন ও জীবিকা। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা ছাড়া হঠাৎ করে রিকশা নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
রিকশার জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হলো যাত্রীর সুবিধা। বাস কিংবা মেট্রোরেল নির্দিষ্ট রুটে চলাচল করে। কিন্তু একজন যাত্রীকে বাসস্টপ বা মেট্রো স্টেশন থেকে বাসা, অফিস, বাজার কিংবা অন্য গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। এখানেই তৈরি হয় ‘লাস্ট মাইল কানেক্টিভিটি’র সমস্যা। রিকশা এই শূন্যস্থান পূরণ করে। এটি দরজা থেকে গন্তব্য পর্যন্ত যাতায়াতের সুবিধা দেয়। বিশেষ করে অল্প দূরত্বে, সরু গলিতে এবং আবাসিক এলাকায় রিকশার কার্যকর বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও পরিবর্তন করেছে। মালিকদের জন্য এটি লাভজনক, কারণ তুলনামূলক কম সময়ে বেশি ট্রিপ দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে যাত্রীরাও কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর কারণে ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রতি আগ্রহী। একই ভাড়ায় প্যাডেলচালিত রিকশার তুলনায় দ্রুত পৌঁছানো যায় বলে সাধারণ মানুষ এটিকে বেশি সুবিধাজনক মনে করেন। কিন্তু যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, চালকের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত মানদণ্ড না থাকায় নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, রিকশাই কি ঢাকার যানজটের মূল কারণ? রিকশা রাস্তার জায়গা ব্যবহার করে এবং এর ধীরগতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য যানবাহনের গতি কমতে পারে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঢাকার ভয়াবহ যানজটের জন্য শুধু রিকশাকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। যানজটের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামো, অবৈধ পার্কিং, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, রাস্তা দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কার্যকর গণপরিবহনের অভাব। তাই যানজটের জন্য শুধু রিকশাকে দায়ী করা হলে সমস্যার মূল কারণগুলো আড়ালে পড়ে যায়।
ধরা যাক, কোনো সিদ্ধান্তে হঠাৎ করেই ঢাকার ৮ থেকে ১০ লাখ রিকশা কমিয়ে দেওয়া হলো। তখন রিকশায় চলাচল করা বিপুলসংখ্যক যাত্রী কোথায় যাবে? এত বড়সংখ্যক চালক কোন পেশায় যুক্ত হবেন? বিদ্যমান বাস ব্যবস্থা কি অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনে সক্ষম? মেট্রোরেল কি ঢাকার প্রতিটি এলাকায় পৌঁছাতে পারবে? অল্প দূরত্বের যাতায়াতের বিকল্প কী হবে? সরু গলি ও আবাসিক এলাকার মানুষের চলাচল কীভাবে নিশ্চিত করা হবে? এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর ছাড়া শুধু রিকশা কমানোর সিদ্ধান্ত নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তেই থাকবে। বরং প্রয়োজন রিকশাকে একটি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। শহরের বিপুলসংখ্যক রিকশা এখনো নিবন্ধনের বাইরে। অনেক চালকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে গতি ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই প্রথমেই সব রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে এবং একটি কার্যকর ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।
চালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা জরুরি। শুধু রিকশা চালাতে জানলেই একজন চালক সড়কে চলাচলের উপযুক্ত হয়ে যান না। ট্রাফিক আইন, যাত্রী নিরাপত্তা এবং সড়ক ব্যবহারের মৌলিক নিয়ম সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকতে হবে। ব্যাটারিচালিত রিকশার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও গতিসীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শহরের প্রধান সড়ক ও উচ্চগতির করিডরে রিকশা চলাচল সীমিত করা যেতে পারে, তবে তার আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
রিকশাকে পুরোপুরি সমস্যা হিসেবে না দেখে নগর পরিবহন ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই বেশি বাস্তবসম্মত। বিশেষ করে বাস ও মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে রিকশাকে পরিকল্পিত ‘লাস্ট মাইল ট্রান্সপোর্ট’ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্টসংখ্যক রিকশা, পরিকল্পিত রিকশা স্ট্যান্ড এবং নির্ধারিত রুটের মাধ্যমে এই খাতকে আরও সুশৃঙ্খল করা সম্ভব।
ঢাকার পরিবহন সংকটের সমাধান কোনো একটি যানবাহনকে সরিয়ে দেওয়ার মধ্যে নেই। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা। বাস, মেট্রোরেল, রিকশা, হাঁটার উপযোগী পথ এবং অন্যান্য পরিবহনব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। একই সঙ্গে যেসব মানুষ রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কথাও ভাবতে হবে।
রিকশা ঢাকার প্রয়োজন—এ কথা যেমন সত্য, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত রিকশার বিস্তারও নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সমস্যা। তাই প্রয়োজন আবেগনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। রিকশা কমানোর আগে বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে, চালকদের কর্মসংস্থানের বিকল্প তৈরি করতে হবে এবং নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, গতিসীমা ও নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে রিকশাকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়; প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা। ঢাকার রিকশা সমস্যার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রিকশা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে একে নগর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করাই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান।
শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি














