আবাসিক হোটেলে অভিযান: আটক নারীর মুখ দেখাতে বাধ্য করার অভিযোগ

45 বার পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

 

রাজধানীর আবদুল্লাহপুরের নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে আটক কয়েকজন নারীর মুখ দেখানোর জন্য পুলিশ সদস্যদের চাপ প্রয়োগ করতে দেখা যায়। এ সময় এক নারীকে কাঁদতেও দেখা যায়।

 

ভিডিওতে কয়েকজন নারী শাড়ির আঁচল, ওড়না, মাস্ক ও হাত দিয়ে নিজেদের মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের দুই নারী সদস্য তাদের মুখের কাপড় সরিয়ে দিতে বাধ্য করেন। এ সময় এক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, মুখ ঢেকে রাখলে মারধরের হুমকি দেওয়া হবে।

 

ভিডিওটি গত ১২ আগস্টের বলে জানা গেছে। ওই দিন আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার নিউ রংধনু আবাসিক হোটেলে ডিবির একটি দল অভিযান চালায়। অভিযানের সময়ই ভিডিওটি ধারণ করা হয়। পরে ইউটিউবার ও কিছু সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়ে।

 

আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য মুখ দেখানোর প্রয়োজন হতে পারে—এমন যুক্তি পুলিশের পক্ষ থেকে দেওয়া হলেও মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা বলছেন, কাউকে জনসম্মুখে মুখ দেখাতে বাধ্য করা বা অপমানজনক আচরণ করা আইনসঙ্গত নয়।

 

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান বলেন, কেউ অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিচার আদালতে হবে। কিন্তু বিচার হওয়ার আগেই পুলিশ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে না, যা এক ধরনের শাস্তির মতো হয়ে দাঁড়ায়।

 

‘মুখ ঢাকবি না’ নির্দেশ কে দিয়েছিলেন

অভিযানের সময় ডিবির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির উপস্থিত ছিলেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, আটক নারীদের মুখ ঢাকতে বাধা দেওয়ার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। একটি ভিডিওতেও তাঁকে এ ধরনের কথা বলতে শোনা যায়।

 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইলিয়াস কবির। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য অনেক সময় মাস্ক বা মুখ ঢাকার কাপড় সরাতে বলা হতে পারে। তবে কোনো পুলিশ সদস্য কাউকে জোর করে মুখ দেখাননি বলে দাবি করেন তিনি।

 

ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের নারীদের মুখের কাপড় সরাতে বাধ্য করার দৃশ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ইলিয়াস কবির বলেন, ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করা হয়নি। কাজ করতে গিয়ে ভুল হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

অভিযানের ভিডিও নিয়ে প্রশ্ন

নিউ রংধনু হোটেলের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আবাসিক হোটেল, বার, ফ্ল্যাট ও বিভিন্ন তল্লাশিচৌকিতে পুলিশের অভিযানের আরও কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

পুলিশ ও ইউটিউবারদের সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো অভিযানের আগে পুলিশ কর্মকর্তারা ইউটিউবারদের ডেকে নেন। পরে এসব ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয় এবং সেখান থেকে ‘ভিউ’ ও আয় আসে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী মনে করেন, পুলিশের অভিযানে ইউটিউবার বা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অভিযান শেষে পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারে।

 

তিনি বলেন, ‘ভিউ’ পাওয়ার জন্য কোনো কোনো সাংবাদিক বা কনটেন্ট নির্মাতা অনৈতিক কিংবা বেআইনি কাজে অংশ নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

 

আইন কী বলে

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে কাউকে নির্যাতন করা কিংবা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ বা দণ্ড দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

 

এ ছাড়া ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর গ্রেপ্তার বা সন্দেহভাজন হিসেবে আটক ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দায়িত্বের সীমার মধ্যে থাকার নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়েও রুল জারি করা হয়েছিল।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গণমাধ্যমে পাঠানো ছবি ও ভিডিওতে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুখ অনেক সময় অস্পষ্ট করে প্রকাশ করছে। তবে নিউ রংধনু হোটেলের ভিডিওতে এর বিপরীত আচরণের অভিযোগ উঠেছে।

 

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, কাউকে মুখ দেখাতে বাধ্য করার এমন চর্চা আইন অনুমোদন করে না। উদ্দেশ্য যা-ই হোক, বেআইনি আচরণ বন্ধ করা উচিত।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted