যুদ্ধ শেষ হলেও থামেনি রমা চৌধুরীর লড়াই

২ বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা 

 

যে নারী একাত্তরের নির্মমতা সহ্য করেও কলম থামাননি, সন্তান হারানোর শোক বুকে নিয়েও জীবনসংগ্রাম চালিয়ে গেছেন—তিনি রমা চৌধুরী। খালি পায়ে নিজের লেখা বই ফেরি করা সেই মহীয়সী নারীর জীবন জানলে, হয়তো স্বাধীনতার গল্পটাকেও নতুন করে অনুভব করবে মন। চোখের সামনে নিজের তিন সন্তানকে হারিয়েছিলেন তিনি। নিজের হাতেই সন্তানদের এই মাটির নিচে সমাধিস্থ করেছিলেন। তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলার মাটিতে জুতা পায়ে হাঁটেননি কবি ও বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী। কেউ জুতা পায়ে হাঁটতে বললে বেদনাভরা কণ্ঠে বলতেন, “আমার তিন ছেলে মাটির নিচে। তাদের শরীরের ওপর দিয়ে জুতা পায়ে আমি হাঁটি কী করে? আমার সন্তানদের কষ্ট হবে না?” রমা চৌধুরীর জীবন ছিল একাত্তরের ভয়াবহতা, সন্তান হারানোর বেদনা আর দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের এক করুণ গল্প। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক নির্যাতিতা নারী, লেখিকা এবং জীবনের কঠিন সময়ের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এক সাহসী মানুষ।

 

১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রমা চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর হিসেবে পরিচিত। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

 

১৯৭১ সালের ১৩ মে তাঁর জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ এক দিন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়। তিনি নির্যাতনের শিকার হন। জীবন বাঁচাতে পরে বাড়ির পাশের পুকুরে লুকিয়ে থাকেন। কিন্তু সেখানেও নিরাপদ ছিলেন না। হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দূর থেকে নিজের ঘর, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সাহিত্যকর্ম পুড়ে যেতে দেখেন তিনি। চেষ্টা করেও সেগুলো রক্ষা করতে পারেননি। এরপর মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টিই বৃদ্ধা মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁকে কাটাতে হয়েছে বন-জঙ্গলে লুকিয়ে। কখনো ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িতে খড়কুটো দিয়ে, কখনো পলিথিন টাঙিয়ে রাত কাটিয়েছেন। নিরাপদ আশ্রয়, সহযোগিতা কিংবা স্বস্তির জীবন—কোনোটিই তখন তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।

 

যুদ্ধ একদিন শেষ হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু রমা চৌধুরীর জীবনের যুদ্ধ শেষ হয়নি। স্বাধীনতার পরও তাঁকে লড়তে হয়েছে দারিদ্র্য, একাকিত্ব ও সামাজিক অবহেলার সঙ্গে। একে একে হারিয়েছেন তাঁর তিন সন্তান—সাগর, টগর ও টুনুকে। সন্তান হারানোর সেই শোক তাঁকে আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

 

তবু থেমে যাননি তিনি। বেঁচে থাকার তাগিদে লেখালেখিকে নিজের জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ও নিজের জীবনের কথা তুলে ধরেন তাঁর আলোচিত গ্রন্থ ‘একাত্তরের জননী’-তে। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি। শুধু বই লিখেই তিনি থেমে থাকেননি। জীবিকার প্রয়োজনে নিজের লেখা বই নিজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বই বিক্রি করেছেন। কখনো রোদে পুড়েছেন, কখনো বৃষ্টিতে ভিজেছেন। অনেক সময় খালি পায়েই বই নিয়ে পথে নেমেছেন। শারীরিক অসুস্থতা ও বয়সের ভারও তাঁকে থামাতে পারেনি। চট্টগ্রামের ব্যস্ত রাস্তায় হয়তো অনেকেই তাঁকে দেখেছেন—এক বৃদ্ধা, হাতে নিজের লেখা বই, পায়ে জুতা নেই। হয়তো অনেকেই জানতেন না, এই সাধারণ চেহারার মানুষটির বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে একাত্তরের ভয়াবহ স্মৃতি, তিন সন্তান হারানোর বেদনা আর দীর্ঘ জীবনের অসংখ্য না-বলা গল্প। ২০১৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে ৭৯ বছর বয়সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ   হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রমা চৌধুরী।

 

তিনি চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন তাঁর লেখা, তাঁর স্মৃতি এবং একাত্তরের এক নারীর জীবনের কঠিন বাস্তবতার সাক্ষ্য। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধ শেষ হলেই সব যুদ্ধ শেষ হয়ে যায় না। কখনো কখনো যুদ্ধের ক্ষত একজন মানুষকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। এই মহীয়সী বীরাঙ্গনার প্রয়াণবার্ষিকীতে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

 

শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted