ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে?

239 বার পঠিত

ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে তা নিয়ে চিন্তিত? এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৫ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পাসপোর্ট ফি, অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া এবং সকল ধাপ বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ঝামেলাহীনভাবে নিজের ই-পাসপোর্ট করার জন্য সম্পূর্ণ গাইডলাইনটি পড়ুন।

ই-পাসপোর্ট কেন এবং এর সুবিধা

বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভ্রমণ এবং পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নথি হলো পাসপোর্ট। আর সেই পাসপোর্ট যদি হয় ইলেকট্রনিক বা ই-পাসপোর্ট, তাহলে এর নিরাপত্তা ও সুবিধা দুটোই বেড়ে যায় বহুগুণে। বাংলাদেশ সরকারও এখন নাগরিকদের জন্য সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রযুক্তির ই-পাসপোর্ট চালু করেছে। কিন্তু অনেকেই ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে বা এর সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানেন না বলে দ্বিধায় ভোগেন।

এই আর্টিকেলটি তাদের জন্য, যারা ঘরে বসেই ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার কথা ভাবছেন। এখানে আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করব ই-পাসপোর্ট কী, এর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া, ফি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে। এই লেখাটি পড়ার পর আশা করি আপনার মনে ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না।

ই-পাসপোর্ট আসলে কী?

ই-পাসপোর্ট (e-Passport) হলো একটি বায়োমেট্রিক পাসপোর্ট, যেখানে একটি ইলেকট্রনিক মাইক্রোপ্রসেসর চিপ যুক্ত থাকে। এই চিপের মধ্যে পাসপোর্টধারীর বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও বায়োমেট্রিক তথ্য, যেমন—ছবি, আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট), এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান সংরক্ষিত থাকে।

সাধারণ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP)-এর চেয়ে ই-পাসপোর্ট অনেক বেশি নিরাপদ। এর ডেটা নকল করা প্রায় অসম্ভব, যা আপনার পরিচয়কে সুরক্ষিত রাখে। বিশ্বের অনেক দেশের এয়ারপোর্টে এখন ই-গেট সিস্টেম চালু হয়েছে, যেখানে ই-পাসপোর্টধারীরা খুব দ্রুত এবং সহজে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করতে পারেন।

ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে: প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা

ই-পাসপোর্ট আবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সঠিক কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা। বয়স, পেশা এবং আবেদনের ধরন অনুযায়ী কাগজপত্রের কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। নিচে একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দেওয়া হলো।

সকল আবেদনকারীর জন্য সাধারণ কাগজপত্র:

১. অনলাইন আবেদনের সামারি (Application Summary): ই-পাসপোর্টের সরকারি ওয়েবসাইটে আবেদন ফরম পূরণ করার পর এটির একটি প্রিন্ট কপি নিতে হবে।

২. পেমেন্ট স্লিপ (Payment Slip): নির্ধারিত পাসপোর্ট ফি জমা দেওয়ার পর ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত রশিদ অথবা অনলাইন পেমেন্টের প্রমাণপত্রের প্রিন্ট কপি।

৩. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC):

  • * ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)-এর মূল কপি ও একটি ফটোকপি অবশ্যই লাগবে। যাদের NID নেই, তারা আবেদন করতে পারবেন না।
  • * ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য: ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC)-এর মূল কপি ও একটি ফটোকপি। জন্ম নিবন্ধনটি অবশ্যই অনলাইনে ভেরিফাইড হতে হবে।
  • * ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বয়স হলে: জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC) যেকোনো একটি দিয়ে আবেদন করা যাবে। তবে NID দিয়ে করা ভালো।

৪. পূর্ববর্তী পাসপোর্ট (যদি থাকে): যদি আপনার আগে কোনো পাসপোর্ট (MRP বা পুরোনো ই-পাসপোর্ট) থেকে থাকে, তবে তার মূল কপি ও ডাটা পেজের (ছবিযুক্ত পাতা) একটি ফটোকপি জমা দিতে হবে। মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও এটি আবশ্যক।

বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র:

  • শিশুদের জন্য (৬ বছরের নিচে):
    • বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
    • আবেদনকারীর 3R সাইজের ল্যাব প্রিন্ট রঙিন ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড)।
  • সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য:
    • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তর থেকে প্রাপ্ত অনাপত্তিপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) অথবা সরকারি আদেশ (GO)।
  • পেশাগত প্রমাণের জন্য:
    • ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশার ক্ষেত্রে পেশাগত সনদের ফটোকপি জমা দিতে পারেন। এটি পাসপোর্টে আপনার পেশা উল্লেখ করতে সাহায্য করবে।
  • তথ্য সংশোধনের জন্য:
    • নাম, বয়স বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করতে চাইলে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (SSC/HSC), নিকাহনামা (বিবাহিতদের জন্য) বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের এফিডেভিট (হলফনামা) প্রয়োজন হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সকল ফটোকপি অবশ্যই মূল কপির সাথে নিয়ে যেতে হবে। কর্মকর্তারা যাচাই করার জন্য মূল কপি দেখতে চাইতে পারেন। বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজপত্র সত্যায়িত করার প্রয়োজন হয় না।

ই-পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে গাইডলাইন

সঠিকভাবে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি সহজেই আবেদন করতে পারবেন।

ধাপ ১: আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ও পেমেন্ট নির্ধারণ

আবেদনের শুরুতেই আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কোন মেয়াদে এবং কত পৃষ্ঠার পাসপোর্ট চান। কারণ এর ওপর আপনার ফি নির্ভর করবে। এরপর আপনার বর্তমান ঠিকানার অধীনে কোন পাসপোর্ট অফিস রয়েছে, তা নিশ্চিত হয়ে নিন।

ধাপ ২: পাসপোর্ট ফি পরিশোধ

আপনি দুইভাবে পাসপোর্ট ফি জমা দিতে পারেন:

  • অনলাইন পেমেন্ট: A-Challan ওয়েবসাইট বা e-Kpay অ্যাপ ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ) বা কার্ডের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করা যায়।
  • ব্যাংকের মাধ্যমে: সোনালী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া এবং ঢাকা ব্যাংকের যেকোনো শাখায় নির্ধারিত কোডে টাকা জমা দিয়ে রশিদ সংগ্রহ করতে পারেন।

২০২৫ সাল অনুযায়ী ই-পাসপোর্ট ফি-এর তালিকা:

পাসপোর্টের ধরনপৃষ্ঠা সংখ্যামেয়াদডেলিভারির ধরনফি (VAT সহ)
ই-পাসপোর্ট৪৮ পৃষ্ঠা৫ বছররেগুলার৳৪,০২৫
এক্সপ্রেস৳৬,৩২৫
সুপার এক্সপ্রেস৳৮,৬২৫
ই-পাসপোর্ট৪৮ পৃষ্ঠা১০ বছররেগুলার৳৫,৭৫০
এক্সপ্রেস৳৮,০৫০
সুপার এক্সপ্রেস৳১০,৩৫০
ই-পাসপোর্ট৬৪ পৃষ্ঠা৫ বছররেগুলার৳৬,৩২৫
এক্সপ্রেস৳৮,৬২৫
সুপার এক্সপ্রেস৳১২,০৭৫
ই-পাসপোর্ট৬৪ পৃষ্ঠা১০ বছররেগুলার৳৮,০৫০
এক্সপ্রেস৳১০,৩৫০
সুপার এক্সপ্রেস৳১৩,৮০০

ধাপ ৩: অনলাইনে আবেদন ফরম পূরণ

ফি জমা দেওয়ার পর বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট অনলাইন পোর্টালে (www.epassport.gov.bd) গিয়ে আবেদন ফরম পূরণ শুরু করুন।

  • সঠিক তথ্য প্রদান: আপনার NID বা জন্ম নিবন্ধন সনদ অনুযায়ী নাম, ঠিকানা, জন্মতারিখ ইত্যাদি সাবধানে পূরণ করুন। কোনো ভুল হলে ভবিষ্যতে বড় সমস্যায় পড়তে পারেন।
  • পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন: আপনার বর্তমান ঠিকানার নিকটস্থ পাসপোর্ট অফিস নির্বাচন করুন।
  • অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডেট: ফরম পূরণের শেষে আপনি একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ পাবেন। ওই তারিখে আপনাকে অফিসে উপস্থিত হতে হবে।

ধাপ ৪: বায়োমেট্রিক তথ্য প্রদান

নির্ধারিত তারিখে প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্রের মূল কপি ও ফটোকপি নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে যান।

  • ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন: প্রথমে আপনার কাগজপত্র জমা দিলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা তা যাচাই করবেন।
  • ছবি তোলা: এরপর নির্দিষ্ট বুথে আপনার ছবি তোলা হবে। ফরমাল পোশাক ও মার্জিতভাবে যাওয়াই শ্রেয়।
  • ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিশ স্ক্যান: সবশেষে আপনার দশ আঙুলের ছাপ এবং দুই চোখের আইরিশ স্ক্যান নেওয়া হবে।

এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে, যা পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় অবশ্যই লাগবে।

ধাপ ৫: পুলিশ ভেরিফিকেশন

নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে এবং স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন হলে পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়। আপনার দেওয়া স্থায়ী ঠিকানায় পুলিশের একজন কর্মকর্তা তদন্তের জন্য যাবেন। এসময় তাকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন। সাধারণত নবায়নের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন হয় না।

ধাপ ৬: পাসপোর্ট ডেলিভারি ও সংগ্রহ

পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পজিটিভ হলে আপনার পাসপোর্ট প্রিন্টিং-এর জন্য পাঠানো হয়। আপনি অনলাইন পোর্টালে আপনার আবেদনের স্ট্যাটাস চেক করতে পারবেন। মোবাইলে SMS-এর মাধ্যমেও আপনাকে জানানো হবে।

পাসপোর্ট প্রস্তুত হয়ে গেলে ডেলিভারি স্লিপ নিয়ে অফিসে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন। সংগ্রহ করার সময় অবশ্যই পাসপোর্টের সব তথ্য ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করে নিন।

সাধারণ কিছু ভুল যা এড়িয়ে চলবেন

  • তথ্যের গড়মিল: আবেদন ফরমের তথ্যের সাথে NID বা জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের যেন কোনো অমিল না থাকে।
  • দালালের সাহায্য নেওয়া: পাসপোর্ট অফিস দালালমুক্ত। নিজে আবেদন করলে সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচবে।
  • ভুল ফি জমা দেওয়া: আপনার প্রয়োজনীয় পাসপোর্টের ধরন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ ফি জমা দিন।
  • কাগজপত্র অসম্পূর্ণ রাখা: আবেদনের দিন সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে রাখুন।

বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট পেতে কতদিন সময় লাগে?

উত্তর: ডেলিভারির ধরনের ওপর সময় নির্ভর করে। রেগুলার ডেলিভারিতে ১৫-২১ কার্যদিবস, এক্সপ্রেস ডেলিভারিতে ৭-১০ কার্যদিবস এবং সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারিতে ২-৩ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

প্রশ্ন: আমি কি জন্ম নিবন্ধন দিয়ে আবেদন করতে পারব? আমার বয়স ২২ বছর।

উত্তর: না। আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়স হলে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা বাধ্যতামূলক। আপনাকে আগে NID করে তারপর পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে হবে।

প্রশ্ন: পাসপোর্টের তথ্য ভুল হলে সংশোধনের উপায় কী?

উত্তর: তথ্য সংশোধনের জন্য সাপোর্টিং ডকুমেন্টস (যেমন: শিক্ষাগত সনদ, NID) সহ রি-ইস্যুর জন্য আবেদন করতে হবে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান করতে হবে।

শেষ কথা

ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে এবং এর পুরো প্রক্রিয়াটি এখন আপনার হাতের মুঠোয়। সঠিকভাবে প্রস্তুতি নিলে এবং উপরের ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি কোনো প্রকার ঝামেলা ছাড়াই আপনার ই-পাসপোর্টটি তৈরি করে ফেলতে পারবেন। মনে রাখবেন, সঠিক তথ্য ও স্বচ্ছতা আপনাকে যেকোনো জটিলতা থেকে মুক্ত রাখবে। আপনার নিরাপদ ও আনন্দময় ভ্রমণের জন্য ই-পাসপোর্ট হোক প্রথম সফল পদক্ষেপ।

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted