কবি নজরুল সরকারি কলেজের গেট দিয়ে কয়েক কদম এগোলেই ভিক্টোরিয়া পার্ক। কলেজসংলগ্ন এই পার্কে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায়ই ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত রবিবার দুই শিক্ষার্থীকে ডেকে নিয়ে মারধরের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার একটি ভিডিও এরই মধ্যে কবি নজরুল সরকারি কলেজের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পার্ক এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা।
গত রবিবারের মারধরের ঘটনায় ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী জানান, দুপুরে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। এ সময় রনক নামে এক শিক্ষার্থী পার্কের ভেতর ডাকেন তাদের। ডাকার পর সাথে থাকা কয়েকজন বন্ধু কলেজের ভেতরে চলে যায় আর কয়েকজন সেখানেই থাকে। পরে পেছন থেকে তাকে ও নয়নকে নিয়ে গিয়ে রনক, আল-আমিন ও সাকিব তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন।
ভুক্তভোগীর দাবি, মারধরের পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। তার অভিযোগ, রনক কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমেদ ফাহিমের অনুসারী। ওই সময় রনকের সঙ্গে কবি নজরুল সরকারি কলেজের ইন্টারের কয়েকজন শিক্ষার্থীও ছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে সাকিব ছিনতাইয়ের সঙ্গেও জড়িত বলে অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থী।
গত রবিবারের মারধরের একটি ভিডিও পরে কবি নজরুল সরকারি কলেজের বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে।
জানা গেছে, রনক এ বছর কবি নজরুল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। বর্তমানে তিনি কলেজসংলগ্ন এলাকায় একটি কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছেন। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ওই কোচিংটি ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমেদ ফাহিমের।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর কলেজ ছাত্রদলের উদ্যোগে আয়োজিত নবীনবরণ অনুষ্ঠানেও মারধরের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, ওই দিন তার বন্ধু রোহানকে কোনো কারণ ছাড়াই কলেজের মাঠের পাশে আল-আমিন থাপ্পড় মারেন। বিষয়টি ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমেদ ফাহিমকে জানানোয় তার ওপর ক্ষুব্ধ হন কয়েকজন।
ওই শিক্ষার্থীর দাবি, পরে তাকে টেনে পার্কের পাশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ১৫ থেকে ২০ জন মিলে তাকে বেধড়ক মারধর করেন। এ সময় কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী বাধা দিলে তাদের সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, ভিক্টোরিয়া পার্কে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পার্কে হাঁটতে আসা সাধারণ মানুষও আতঙ্কে থাকেন।
নিয়মিত পার্কে হাঁটতে আসা শিউলি বেগম বলেন, কলেজ খোলা থাকলে পার্কের হাঁটার রাস্তায় শিক্ষার্থীদের জটলা দেখা যায়। হঠাৎ তাদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ি ও মারামারি শুরু হয়ে যায়। এতে পার্কে আসা সাধারণ মানুষকেও ভয়ে থাকতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ছিনতাইয়ের অভিযোগ করে বলেন, তার পরিচিত একজনের কাছ থেকে ৩৯ হাজার টাকা মূল্যের একটি মোবাইল ফোন ও নগদ এক হাজার টাকা নিয়ে গেছে কয়েকজন। তিনি বলেন, ‘বড় ভাই ফোন দিয়ে বলতেছে, ভাইয়ের ফোন নিয়ে গেছে। আমি যাওয়ার পর জানতে পারি, তারা ছয়-সাতজন ছিল। তাকে আটকিয়ে ফোন ও টাকা নিয়ে গেছে।’
পার্কে এ ধরনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে ঘটছে বলে জানিয়েছেন কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইরফান আহমেদ ফাহিম। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ পার্কে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে এসব ঘটনায় জড়িয়ে না যায়, সে জন্য তাদের বিরত রাখতে আমি ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বুঝিয়েছি।’
তবে রনকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে ইরফান আহমেদ ফাহিম বলেন, ‘দাবি তো করাই যায়। কেউ মৌখিকভাবে বলে দিলেই সেটা প্রমাণ হয়ে যায় না। যাদের নাম আসছে, মারামারির যে ভিডিও সামনে এসেছে, সেখানে তাদের দেখা যায় না। রনক নামে যে ছেলেটির কথা বলা হচ্ছে, সে বরং মারামারি থামাচ্ছিল।’
পার্কের পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের আচরণ নিয়ে কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক কানন ইসলাম বলেন, ‘পার্ক মানসিক বিকাশের জায়গা। শিক্ষার্থীরা মানসিক প্রশান্তির জন্য পার্কে যায়। পার্কে যাতে সবাই নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমি চাই ক্যাম্পাসে সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকুক। সিনিয়ররা যেন জুনিয়রদের জন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে। র্যাগিং বা কোনো ধরনের হয়রানি যেন না হয়। জুনিয়ররা যাতে তাদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারে।’
কানন ইসলাম আরও বললেন, ‘ইতিপূর্বে যেসব শিক্ষার্থী এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের নিজেদের সংশোধন করে নেওয়া উচিত। তাদের দুর্ব্যবহারের কারণে যেন সিনিয়র ছাত্রনেতাদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি না হয়। যারা এসব জুনিয়রদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাদের প্রতিও অনুরোধ থাকবে, তারা যেন তাদের ভালো পথে চলার পরামর্শ দেন।’
কলেজ শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রোমান আহমেদ বলেন, আমরা ক্যাম্পাসে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা চাই না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও ভয়হীন পরিবেশ চাই। মতের ভিন্নতা থাকলেও সংঘাত নয়, আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য। আসুন, দল-মত নির্বিশেষে সবাই মিলে শিক্ষার সুষ্ঠু ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করি।”
নিজস্ব প্রতিবেদক, কবি নজরুল সরকারি কলেজ















