সাকিবুল হাছান
মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে এসে মিশরের ঐতিহ্যবাহী আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ একাডেমিক পরিমণ্ডল পেরিয়ে এবার যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গবেষণার স্বাক্ষর রাখলেন বাংলাদেশি গবেষক মাওলানা লুৎফুর রহমান বিন ইসহাক খান আল-আযহারী। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি তাঁর দ্বিতীয় পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।
গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তাঁর পিএইচডি গবেষণার ডিসকাশন ও থিসিস ডিফেন্স (মুনাকাশা) অনুষ্ঠিত হয়। গবেষণাটি সম্মানিত ডিসকাশারদের প্রশংসা অর্জন করে এবং তাঁকে সর্বোচ্চ ফলাফল “Excellent (ممتاز)” প্রদান করা হয়।
তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল—
«الدبلوماسية وآثارها في العلاقات الدولية في جنوب آسيا: بنجلاديش وباكستان والهند من عام 1947 إلى عام 2025»
“দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব: ১৯৪৭–২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন”
“Diplomacy and Its Impact on International Relations in South Asia: Bangladesh, Pakistan and India (1947–2025)”
বিস্তৃত এই গবেষণায় ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এবং ১৯৭১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যকার যুদ্ধ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিকও গবেষণার আওতায় এসেছে।
এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রফেসর ড. বাহের ইব্রাহিম আল-বাশিশী।
এক গবেষকের একাধিক জ্ঞানভুবন
লুৎফুর রহমান আল-আযহারীর একাডেমিক যাত্রার বিশেষত্ব শুধু দ্বিতীয় পিএইচডি অর্জনে নয়; তাঁর গবেষণার বিস্তৃত পরিসরেও রয়েছে স্বাতন্ত্র্য। ইসলামি আইন ও ফিকহের মতো ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানশাস্ত্র থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির মতো আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তিনি গবেষণা করছেন।
আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল সম্পন্ন করার পর সেখানে তিনি ফিকহ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগেও শুরু করেছেন তাঁর তৃতীয় পিএইচডি গবেষণা।
ফলে তাঁর গবেষণার পরিসরে একদিকে রয়েছে ফিকহ ও ইসলামি আইন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্য। ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানশাখায় এই ধারাবাহিক গবেষণাযাত্রা তাঁর একাডেমিক পথচলাকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা।
বরিশালের বাগধা থেকে আল-আযহার:
বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের মরহুম ইসহাক খান সাহেবের জ্যেষ্ঠ সন্তান লুৎফুর রহমান আল-আযহারী। দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থায় তাঁর শৈশব ও কৈশোরের শিক্ষাজীবনের ভিত্তি তৈরি হয়।
২০০৬ ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ছারছীনা দারুস সুন্নাহ আলিয়া মাদ্রাসা থেকে যথাক্রমে দাখিল ও আলিম পরীক্ষায় জিপিএ-৫ (A+) অর্জন করেন তিনি।
ফাজিল অধ্যয়নকালীন ২০০৯ সালের নভেম্বরে স্কলারশিপ নিয়ে মিশরে পাড়ি জমান। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে তাঁর উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়।
২০১০ সালে আল-আযহার ফরেন ইনস্টিটিউট থেকে ছানুভিয়া (HSC সমমান) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ২০১০–২০১১ শিক্ষাবর্ষে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অ্যান্ড ল’ অনুষদে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। জীবনে উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়:
এরপর দীর্ঘ চার বছর অধ্যয়ন শেষে ২০১৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে B.A Hons (স্নাতক) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন লুৎফুর রহমান আল-আযহারী।
আল-আযহারের ঐতিহ্যবাহী একাডেমিক পরিবেশে এই চার বছরের অধ্যয়ন তাঁর পরবর্তী উচ্চতর শিক্ষা ও গবেষণাজীবনের ভিত্তি তৈরি করে।
ফিকহে এমফিল: বাংলাদেশি ফকিহদের অবদান নিয়ে গবেষণা:
স্নাতক সম্পন্ন করার পর আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অ্যান্ড ল’ অনুষদে মাস্টার্স (M.A) ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন লুৎফুর রহমান আল-আযহারী। এর মধ্য দিয়ে তাঁর উচ্চতর একাডেমিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়।
২০১৫–২০১৬ এবং ২০১৬–২০১৭ শিক্ষাবর্ষে মাস্টার্সের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ সম্পন্ন করার পর তিনি এমফিল গবেষণায় মনোনিবেশ করেন।
তাঁর এমফিল গবেষণার বিষয় ছিল—
«فقهاء بنجلاديش وجهودهم في خدمة المذهب الحنفي: دراسة فقهية تاريخية»
“বাংলাদেশের ফকিহগণ ও হানাফি মাযহাবের খেদমতে তাঁদের অবদান: একটি ফিকহি গবেষণা।”
“Bangladeshi Jurists and Their Contributions to the Service and Development of the Ḥanafī School of Jurisprudence:
A Jurisprudential Study”
দীর্ঘ গবেষণার পর ২০২২ সালের সূচনালগ্নে তাঁর এমফিল থিসিসের ডিফেন্স ও মুনাকাশা অনুষ্ঠিত হয়। থিসিসটি সম্মানিত ডিসকাশারদের প্রশংসা অর্জন করে এবং গবেষককে সর্বোচ্চ ফলাফল “Excellent (ممتاز)” প্রদান করা হয়।
এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন প্রফেসর ড. হাসান সালাহ আল-সগীর। তিনি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র স্কলার কাউন্সিলের মহাসচিব, ফিকহ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক এবং পোস্টগ্র্যাজুয়েট বিভাগের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এমফিল থিসিসের ডিফেন্স ও ডিসকাশনে বহিরাগত পরীক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিশরের সাদাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডিন প্রফেসর ড. আবদুল মুত্তালিব হামাদান। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষক হিসেবে ছিলেন শরিয়াহ অ্যান্ড ল’ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ মুহাম্মাদ আবু সাইয়িদ আহমদ।
আল-আযহারে পিএইচডি:
২০২২ সালে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অ্যান্ড ল’ অনুষদের ফিকহ বিভাগে তিনি পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন।
তাঁর গবেষণার বিষয়—
«الأحكام الفقهية المستجدة المبنية على القياس: دراسة فقهية مقارنة»
“কিয়াসের ভিত্তিতে উদ্ভূত আধুনিক ফিকহি বিধানসমূহ: একটি তুলনামূলক ফিকহি গবেষণা।”
“Contemporary Jurisprudential Rulings Based on Qiyās (Analogical Reasoning): A Comparative Study in Islamic Jurisprudence”
এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে রয়েছেন আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরিয়াহ অ্যান্ড ল’ অনুষদের প্রবীণ অধ্যাপক এবং মিশরের রাষ্ট্রীয় ফতোয়া বোর্ডের অন্যতম ফকিহ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুস সাত্তার আল-জিবালী হাফিযাহুল্লাহ এবং ড. আহমদ আল-কায়াতী হাফিযাহুল্লাহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় পিএইচডি:
আল-আযহারে ফিকহ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণার পাশাপাশি এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগেও তাঁর তৃতীয় পিএইচডি গবেষণার কাজ শুরু হয়েছে।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রুহুল আমিন হাফিযাহুল্লাহর তত্ত্বাবধানে তাঁর গবেষণার বিষয়—
«المذاهب الفقهية ثراء ثقافي وجسر للمعايش المجتمعي»
“ইসলামী ফিকহের মাযহাবসমূহ: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার ও সামাজিক সহাবস্থানের সেতুবন্ধন”
“The Islamic Jurisprudential Schools: A Source of Cultural Enrichment and a Bridge for Social Coexistence”
একই গবেষকের একাধিক পিএইচডি গবেষণা ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রকে স্পর্শ করায় তাঁর একাডেমিক পথচলা পেয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
শিক্ষকতার পাশাপাশি ইলমি খেদমত:
গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতাকেও কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন লুৎফুর রহমান আল-আযহারী।
২০২৩ সালে ‘বাংলার আযহার’খ্যাত ছারছীনা দারুস সুন্নাহ আলিয়া মাদ্রাসায় ইলমি খেদমতের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী শাখায় আরবি প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
এরপর ২০২৫ সালে দারুননাজাত সিদ্দিকীয়া কামিল মাদ্রাসায় প্রভাষক (ফিকহ) হিসেবে যোগদান করেন তিনি। বর্তমানে সেখানেই শিক্ষকতা ও ইলমি খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন।
শিক্ষাদানের পাশাপাশি সাধারণ পাঠক ও গবেষকদের জন্য সমকালীন ও একাডেমিক বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও গবেষণার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন তিনি। তাঁর গবেষণাকর্মের মধ্যে একটি গ্রন্থ ২০২৫ সালে কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয়।
অর্জনের নেপথ্যে পিতার স্বপ্ন:
একাডেমিক সাফল্যের এই দীর্ঘ যাত্রায় পরিবারের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তাঁর মরহুম পিতা মোহাম্মদ ইসহাক খান ছিলেন তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণার উৎস।
জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি একাডেমিক অধ্যায়ে যিনি তাঁকে সাহস দিয়েছেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সন্তানের স্বপ্নকে নিজের স্বপ্ন হিসেবে ধারণ করেছেন—তিনি আজ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, ত্যাগ, ভালোবাসা ও দোয়ার স্মৃতি সন্তানের প্রতিটি অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর জন্য দোয়া করা হয়েছে—মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের সকল নেক আমল, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কুরবানি কবুল করুন, তাঁর কবরকে নূরে পরিপূর্ণ করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সম্মানিত মেহমান হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
তরুণ গবেষকদের জন্য অনুপ্রেরণার এক দৃষ্টান্ত:
লুৎফুর রহমান আল-আযহারীর একাডেমিক পথচলা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিস্তৃত সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বরিশালের একটি গ্রামের শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, এরপর যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি এবং একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হওয়া—তাঁর দীর্ঘ অধ্যবসায় ও গবেষণামুখী মানসিকতারই প্রতিফলন।
ফিকহ, ইসলামি আইন, আরবি ভাষা ও সাহিত্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—ভিন্ন ভিন্ন জ্ঞানশাখায় তাঁর গবেষণার বিস্তার বাংলাদেশের তরুণ গবেষকদের জন্য একটি অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
তাঁর এই অর্জন কেবল একটি ডিগ্রি অর্জনের ঘটনা নয়; বরং মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিমণ্ডলে পৌঁছানোর দীর্ঘ ও অধ্যবসায়পূর্ণ এক যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।















