নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি: চাপে নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন

2 বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা

 

বাজারে গেলে এখন আর আগের মতো স্বস্তি মেলে না। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ কিংবা আলু—প্রতিদিনের রান্নায় প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই সাধারণ মানুষের ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে আয় বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম—এই দুইয়ের চাপে সংসারের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই। ২০১৯ সালের সঙ্গে ২০২৬ সালের নিত্যপণ্যের দামের তুলনা করলে এই পরিবর্তনের একটি চিত্র পাওয়া যায়।

 

২০১৯ সালে মোটা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। মাঝারি চালের দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৫৮ থেকে ৬৮ টাকা। সরু চালের দামও ৫৫ থেকে ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পরিবারের অন্যতম প্রধান খাদ্য চাল কিনতেই এখন আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। চাল-আটার পাশাপাশি ভোজ্যতেলের দামেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায়। অন্যদিকে, খোলা আটার দাম কেজিপ্রতি ২৮ থেকে ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা হয়েছে। প্যাকেটজাত আটার দামও ৩৫ থেকে ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় পৌঁছেছে।

 

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে ডাল ও চিনির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে দেশি মসুর ডালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকা, যা ২০২৬ সালে বেড়ে হয়েছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। খোলা চিনির দাম ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। অন্যদিকে, আলুর দাম ২০ থেকে ২৫ টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় পৌঁছেছে। দেশি পেঁয়াজের দাম স্বাভাবিক সময়ে ৩৫ থেকে ৫০ টাকা থাকলেও বর্তমানে তা ১১০ থেকে ১৩০ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আমিষের উৎসগুলোর দামেও পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে ব্রয়লার মুরগির দাম ছিল কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। গরুর মাংসের দাম ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকায়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টিকর ও বৈচিত্র্যময় খাদ্য রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

 

তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু খাদ্যপণ্যের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। বেড়েছে রিকশাভাড়াও। বেড়েছে বইয়ের দাম, এমনকি একটি কলমের দামও। যে দুটি কলম একসময় ১০ টাকায় কেনা যেত, এখন সেই দুটি কলম কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৫ টাকা। অর্থাৎ, নিত্যদিনের ছোট ছোট প্রয়োজন মেটাতেও আগের তুলনায় বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বই-খাতা, কলম ও যাতায়াতের বাড়তি ব্যয় পড়াশোনার খরচকেও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবার খরচও পরিবারের মাসিক বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে। একটি পরিবারের মাসিক খরচের হিসাব কষলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। খাবারের খরচের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হয়। এর মধ্যে কোনো একটি খাতে খরচ বেড়ে গেলে অন্য খাতের ব্যয় কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন অনেকেই। কিন্তু যখন প্রায় সব খাতেই খরচ বাড়তে থাকে, তখন সেই হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

 

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ টমাস রবার্ট ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বের কথা মনে পড়ে। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে, আর খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় গাণিতিক হারে। তত্ত্বটির সঙ্গে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনা করলে বলা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেন বাড়ছে দ্রুতগতিতে, অথচ মানুষের আয় সেই তুলনায় বাড়ছে ধীরগতিতে। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। তবে এটি ম্যালথাসের তত্ত্বের সরাসরি বক্তব্য নয়; বরং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝাতে তাঁর তত্ত্বের একটি তুলনামূলক প্রয়োগ। এই অসামঞ্জস্যের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর। বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জীবন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। প্রতিদিনই তাঁদের ভাবতে হচ্ছে, কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে মিটবে মাসের খরচ, আর কত দিন এভাবে চলতে হবে। আয় সীমিত, অথচ ব্যয়ের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। মাসের শুরুতে যে হিসাব করা হয়, মাস শেষ হওয়ার আগেই তা এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক সময় প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও কিছু কেনাকাটা বাদ দিতে হয়, কমাতে হয় খাবারের খরচ কিংবা পিছিয়ে দিতে হয় চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি কাজ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে তা আগের অবস্থায় ফিরে আসবে কি না, সেই নিশ্চয়তা থাকে না। দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে, কিন্তু সেই তুলনায় আয় কতটা বাড়ছে? ফলে নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের মনে বারবার একই প্রশ্ন জাগে—এভাবে আর কত দিন চলতে হবে? কবে মিলবে একটু স্বস্তি? নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার এই ধারার শেষ কোথায়, তা যেন কারও জানা নেই। প্রতিদিনের জীবন চালিয়ে নেওয়াটাই যখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা কিংবা সামান্য সঞ্চয় করাও অনেকের কাছে কঠিন হয়ে পড়ে।

 

তবে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয়ের পরিমাণ, বসবাসের স্থান এবং জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী এই চাপের মাত্রা বদলে যায়। তাই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব বুঝতে পণ্যের দাম তুলনার পাশাপাশি মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনও বিবেচনা করা জরুরি। এ পরিস্থিতিতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ও কারসাজি প্রতিরোধ, বাজার তদারকি জোরদার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কৃষক যেন উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পান এবং ভোক্তাও যেন অযৌক্তিক দামে পণ্য কিনতে বাধ্য না হন, সে দিকেও নজর দিতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের উদ্যোগও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

 

বাজারের হিসাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনের হিসাবের সঙ্গেই জড়িত। চাল, ডাল, তেল কিংবা আলুর দাম বাড়লে তা শুধু একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি থাকে না; পরিবারের মাসিক বাজেট, খাবারের অভ্যাস এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনাতেও প্রভাব ফেলে। তাই প্রশ্নটি শুধু নিত্যপণ্যের দাম কত বেড়েছে, তা নয়—প্রশ্ন হলো, মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যাচ্ছে? নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরানো তাই শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনমান, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানুষের চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়—সীমিত আয়ের মধ্যে যেন মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা যায়, সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া যায় এবং মাসের শেষে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে বেঁচে থাকা যায়।নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ কবে দৃশ্যমান হবে, আর সাধারণ মানুষ কবে একটু নিশ্চিন্তে বাঁচার সুযোগ পাবেন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

 

শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted