এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা তবুও অবহেলিত

8 বার পঠিত

অমিত হাসান

 

একটা দেশ কোনদিকে যাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ অঙ্কিত হয় ক্লাসরুমে। আর সে অঙ্কনের বাস্তব রুপ দেন একজন শিক্ষক। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের দেশে শিক্ষাখাত আর শিক্ষক সমাজ বড়ই অবহেলিত। নামমাত্র বেতনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা চাকরি করেন আমাদের দেশের স্কুল, কলেজ, আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে। প্রতি বছর তাদের হাত ধরেই শিক্ষা লাভের সুযোগ গ্রহণ করেন দেশের লক্ষ লক্ষ কোমলপ্রাণ শিক্ষার্থী৷ কিন্তু দেশের ভবিষ্যৎ যাদের হাতে সেই শিক্ষকেরা কেমন আছেন? গ্রামের অল্প শিক্ষিত মাতব্বর থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় লোকেরা পর্যন্ত কটাক্ষ করে কথা বলেন শিক্ষকদের৷ অথচ আমাদের প্রায় সবার বাড়িতেই অল্প ও বাড়ন্ত বয়সের বাচ্চারা আছে। মাঝেমাঝে তাদের শিশুসুলভ দুষ্টুমি, কৌতূহল আর অহেতুক রাগচটা ভাব আমাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া বর্তমান সমাজে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোর গ্যাঙের উপস্থিতিও বেড়েছে। আর ক্লাসরুমে একজন শিক্ষক যখন দাঁড়ান তখন তাঁর সামনে উপবিষ্ট এই ছেলে-মেয়েরাই শিক্ষার্থী পরিচয়ে আসেন একেক গ্রাম বা মহল্লা থেকে, একেক পরিবার থেকে,  আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য আর ভাবনা নিয়ে। সবার মানসিকতা, পারিবারিক পরিবেশ আর শেখার গতিও তাই এক রকম হয় না। তবুও একজন শিক্ষকই তাদের দায়িত্ব নেন। একজন বাবা যেখানে তাঁর এক, দুই বা তিন-চার সন্তানের দুষ্টুমিতেই রেগে যান একজন শিক্ষক সেই অবস্থাতেও শত শিক্ষার্থীর সামনেও শান্ত থাকেন। তাঁকে দিতে হয় কঠিন ধৈর্য্য পরীক্ষা।

 

ক্লাসরুমে শুধু পাঠদানই নয় একজন শিক্ষককে একইসাথে শৃঙ্খলা রক্ষাকারী, পরামর্শক, বিশ্লেষক এবং অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে হয়। আবার সময় বিশেষে শিক্ষার্থীরা নিয়ম ভাঙলে বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়ে পড়লে শিক্ষককে বিচারকের ভূমিকায়ও বাধ্য হয়েই আসতে হয়।  প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বজায় রাখা, ভিন্ন ভিন্ন আচরণ সামলানো এবং প্রশাসনিক কাজের চাপ সামলে ধৈর্য ধরে শিক্ষাদান চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ক্লান্তিকর ও মানসিক শ্রমের বিষয়। তাছাড়া প্রতিটা ক্লাসের আগেই শিক্ষক নিজেই বনে যান শিক্ষার্থী। ক্লাসে গিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের পড়ানোর আগে নিজেকেও পড়তে হয়, জানতে হয় শিক্ষার্থীদের মঙ্গল কামনাতেই। তবুও অন্যান্য পেশার তুলনায় শিক্ষকদের কঠোর পরিশ্রমের অনুপাতে পর্যাপ্ত সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। ফলস্বরূপ কিছু শিক্ষক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার আগে এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির পর প্রাইভেট, টিউশন কিংবা কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার বিকল্প পেশার কথা ভাবতেও বাধ্য হন। এখানেই শেষ নয়। আজকাল একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করলে সে দায়টা তার শিক্ষকদের যেভাবে দেওয়া হয় কিংবা শিক্ষক তার ছাত্র-ছাত্রীকে কোথাও একটু শাসন-বারণ করলেই অভিভাবকেরা যেভাবে ক্ষিপ্ত হচ্ছেন তা যেকোনো শিক্ষকের জন্যই অসম্মানজনক।  প্রচলিত আছে, একবার খলিফা হারুনর রশীদ তাঁর দুই ছেলের শিক্ষার দায়িত্ব নিতে ইমাম মালিককে ডেকে পাঠান। কিন্তু ইমাম মালিক খলিফার সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলে তাঁর ছেলেরা পড়তে চাইলে যেন অন্যান্য ছাত্রের সাথে একই কাতারে বসে পড়ে। আর খলিফাপুত্র বলে যেন অন্য ছাত্রদের থেকে বেশি সুবিধা পাওয়ার আশা না করে। খলিফা সে প্রস্তাবে রাজিও হন।

 

ইতিহাস ঘাঁটলে শিক্ষাগুরুর মর্যাদার কথা হয়তো এমন অনেক পাওয়া যাবে। কিন্তু আজকের এই সময়ে শিক্ষকেরা যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজ শিক্ষার্থীর দ্বারা, কখনো বা অভিভাবক কর্তৃক, কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীর কারণে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন তা নিঃসন্দেহে মর্মস্পর্শী। মনে রাখতে হবে একজন সক্রেটিসের থেকেই প্লেটোর সৃষ্টি। তারপর প্লেটো থেকে অ্যারিস্টটল। আর অ্যারিস্টটল থেকে আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট। তাই শিক্ষাগুরুকে অমর্যাদা, অসম্মান নয় শিক্ষককে দিতে হবে সর্বোচ্চ মর্যাদা। কারণ শিক্ষকদের হাতেই আমাদের আগামীর প্রজন্ম, আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।

 

তরুণ লেখক ও শিক্ষক

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted