জেলা প্রতিনিধি
খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুম ধান কাটার মৌসুমে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষিরা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে পাকা ধান কাটার পাশাপাশি চলছে মাড়াই ও ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি। এ বছর ফলন ভালো হলেও কমেছে জুম চাষের জমি। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট ও তরুণদের অনাগ্রহে ঐতিহ্যবাহী এ কৃষিব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে জুম চাষ হয়েছিল। চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ১৫০ হেক্টরে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে জুম চাষের জমি কমেছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর বা ৫৪ শতাংশ।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বসতবাড়ি সম্প্রসারণ, ফলজ বাগান বৃদ্ধি, জমির সংকট ও উৎপাদন খরচ বাড়ায় অনেক পরিবার আগের মতো জুম চাষ করতে পারছে না। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে।
সীমানা পাড়ার জুমচাষি মিলন ত্রিপুরা জানান, এ বছর তিনি তিন হাঁড়ি জুম ধান চাষ করেছেন। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মণ ধান পেলেও আগের তুলনায় ফলন কমেছে। সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বেড়েছে খরচ। নিজের জমি না থাকায় অন্যের জমির ওপর নির্ভর করতে হয় বলেও জানান তিনি।
মরাটিলা এলাকার চাষি শান্তি ত্রিপুরা বলেন, এ বছর তাঁদের এলাকায় জুম ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে আগের তুলনায় চাষির সংখ্যা কমেছে। পাহাড়ে বসতবাড়ি ও ফলজ বাগান বাড়ায় জুমের জন্য খালি জমি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে শ্রমিক সংকট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভূমির ব্যবহার পরিবর্তন জুম চাষ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আগে নির্দিষ্ট সময় পরপর যেসব পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করা হতো, সেসব এলাকার অনেকটিতে এখন বসতবাড়ি, ফলজ বাগান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদি আয়ের আশায় অনেক পরিবারও ফলজ বাগানের দিকে ঝুঁকছে।
আলুটিলা এলাকার চন্দ্র কিরণ চাকমা বলেন, এখনো পাহাড়ের অনেক পরিবার জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল। ধানের পাশাপাশি জুমে ভুট্টা, তিল, কাউন, মারফা ও মরিচসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা হয়। সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে জুমচাষিরা উপকৃত হবেন বলে মনে করেন তিনি।
জুম চাষে একই জমিতে বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হওয়ায় পাহাড়ি পরিবারের খাদ্যচাহিদা পূরণেও এর ভূমিকা রয়েছে। ফলে জুমের জমি কমে গেলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন চৌধুরী বলেন, পাহাড়ে ফলজ বাগান বাড়ায় জুম চাষের জমি কমছে। উৎপাদন বাড়াতে এ বছর চাষিদের পাঁচ কেজি করে ধানের বীজ ও ২০ কেজি করে রাসায়নিক সার দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) থেকেও বীজ দেওয়া হয়েছে। জুমে ব্রি ধান-৮৩, বিনা ধান-১৯ ও বিনা ধান-২১ চাষ হয়েছে এবং এ বছর তিন জাতেরই ভালো ফলন হয়েছে বলে জানান তিনি। নিয়মিত বৃষ্টিপাতও ফলনের জন্য সহায়ক হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জুমে আধুনিক জাতের ফসল উৎপাদনে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাঠকর্মীরা চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জুম চাষের জমি কমে যাওয়ার কারণগুলোও মোকাবিলা করা প্রয়োজন। উন্নত বীজ ও সার ব্যবহারে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হলেও জমি ক্রমাগত কমতে থাকলে জুমচাষি ও সামগ্রিক উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হবে। জুম চাষ টিকিয়ে রাখতে কৃষি সহায়তা, চাষিদের জীবিকা এবং পাহাড়ি ভূমির ব্যবহার—তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।














