সাকিবুল হাসান
সামাজিক ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবামূলক অবদান এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ মর্যাদাপূর্ণ ‘ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ অর্জন করেছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক মো. আবদুল্লাহ আল সিয়াম।
গত ১৭ অক্টোবর রাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি বিভাগে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন তিনি। পুরস্কার হিসেবে তাঁকে একটি ক্রেস্ট, এক লাখ টাকার চেক ও সনদ দেওয়া হয়। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের তরুণদের স্বেচ্ছাসেবামূলক ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন বিভাগে ১৫ জনকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে এই সম্মাননা অর্জনের মধ্য দিয়ে পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন সিয়াম।
বর্তমানে তিনি আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। এর আগে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
সিয়ামের এই পথচলা শুরু কৈশোরেই। বিজ্ঞান শিক্ষাকে আকর্ষণীয় ও সৃজনশীল করে তোলার প্রত্যয় নিয়ে অল্প বয়সেই নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ সায়েন্স ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে সিনিয়র উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সিয়াম। একই প্রতিষ্ঠানের নিউট্রিশন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পরে সিনিয়র এক্সিকিউটিভ এবং তরুণদের প্ল্যাটফর্ম ইন্টেলিজেন্ট মাইন্ডসের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
২০২৩ সালে অষ্টম ও নবম ডিসিএসি ন্যাশনাল সায়েন্স এক্সপোজিশন আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সিয়াম। এসব আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিজেদের উদ্ভাবনী প্রকল্প ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। একই বছর তিনি ঢাকা কলেজ বিজ্ঞান ক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর গতিশীল নেতৃত্বে দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য এই প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞান ক্লাবের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়।
বিজ্ঞানচর্চা কেবল শহরকেন্দ্রিক হওয়া উচিত নয়—এমন বিশ্বাস থেকে রাজধানীর বাইরেও কার্যক্রম ছড়িয়ে দেন সিয়াম। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব আইসিটি ইন ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে কক্সবাজারের মতো উপকূলীয় ও প্রান্তিক অঞ্চলে নিরাপদ খাদ্য ও পুষ্টিবিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান পরিচালনা করেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ অ্যাডভান্সড রোবোটিক্স রিসার্চ সেন্টারের সঙ্গে কাজ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রোবোটিক্স শিক্ষা ছড়িয়ে দিতেও ভূমিকা রাখেন।
ইন্টেলিজেন্ট মাইন্ডসের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে অনলাইনে আকর্ষণীয় প্রতিযোগিতা, ইভেন্ট টকস এবং ‘মিনিটস অব পজিটিভিটি’ শীর্ষক পডকাস্ট সেশন পরিচালনা করেছেন তিনি। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সিয়াম দেখাতে চেয়েছেন, মেধা সর্বত্রই রয়েছে; প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত সুযোগ ও সহায়তা।
শুধু তাত্ত্বিক বিজ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ না থেকে যানজট নিরসন, বায়ুদূষণ কমানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো জনকল্যাণমূলক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানেও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছেন এই তরুণ। এমনকি বৈশ্বিক করোনা মহামারির সময়েও অনলাইন ওয়েবিনার ও প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন তিনি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক কার্যক্রমে তাঁর সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে টানা তিনবার—৪১তম, ৪২তম ও ৪৩তম আসরে—চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। এ ছাড়া বিভিন্ন বড় বিজ্ঞান কার্নিভালেও একাধিক পুরস্কার অর্জন করেছেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং ঢাকা কলেজে বিভিন্ন কর্মশালা ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষামূলক সেশনের আয়োজন করেন সিয়াম। এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য ছিল শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা, সহশিক্ষা কার্যক্রমকে জনপ্রিয় করে তোলা এবং তাদের সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তায় উৎসাহিত করা।
গতানুগতিক পাঠ্যবইয়ের বাইরে সাম্প্রতিক বিষয়াবলি ও সাধারণ জ্ঞান শেখানোর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন তিনি। কুইজ লীগ এবং প্রান্তিক অঞ্চলে বিশেষ শিক্ষামূলক সেশনের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে আনন্দদায়ক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন সিয়াম।
২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে গেলে সিয়াম তাঁর এই সৃজনশীল কার্যক্রম থেমে যেতে দেননি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশব্যাপী অনলাইন ওয়েবিনার, বিজ্ঞানবিষয়ক কুইজ ও সৃজনশীল কর্মশালার আয়োজন করেন তিনি। মানসিক চাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সেই সময়েও হাজার হাজার তরুণ শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল শিক্ষামূলক কার্যক্রমে যুক্ত রাখতে ভূমিকা রাখেন সিয়াম।
এ পর্যন্ত সিয়ামের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি উপকৃত হয়েছে বাংলাদেশের ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু এই সংখ্যা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের বিকাশে মেন্টরশিপের ইতিবাচক প্রভাব। তাঁর পরিচালিত ক্লাব ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে বিজ্ঞান, রোবোটিক্স ও কুইজ প্রতিযোগিতায় ২০০টির বেশি পুরস্কার অর্জন করেছে। এমনকি তাঁর তৈরি ইভেন্ট আয়োজনের মডেল ও কর্মশালার মডিউলগুলো এখনো তাঁর অনুজরা অনুসরণ করছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর উদ্যোগগুলো একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি পেয়েছে।
ছেলের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বাবা মো. আবদুল হাই বলেন, “এমন অর্জন বাবা হিসেবে আমার জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের। ওর প্রচেষ্টা ও উদ্যমের এত সুন্দর ফলাফল সত্যিই আনন্দের।”
পুরস্কার পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি জানিয়ে মো. আবদুল্লাহ আল সিয়াম বলেন, “প্রায় অর্ধযুগের নিঃস্বার্থ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ পাওয়া এই স্বীকৃতি ও সম্মাননা আমাকে দেশ ও মানুষের কল্যাণে আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে প্রেরণা জোগাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য ও দিকনির্দেশনা আমাকে আমৃত্যু বাংলাদেশের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করবে।”
তরুণ বয়সে সিয়ামের এই জাতীয় স্বীকৃতি দেশের নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।















