মানসিক স্বাস্থ্য: সচেতনতা কি শুধু দিবসকেন্দ্রিক?

2 বার পঠিত

গালিবা আনতারা সোয়ারা

 

সমাজ কী বলে? আমরা কি একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে মনের কথা, সেই কথার শব্দ বুঝতে পারি? হাজার নোটিফিকেশনের ভিড়ে মনকে কি একটু সময় দিই আমরা? যদি উত্তর হয়, হ্যাঁ, দিই—তবে এত মানুষ মানসিক সংকটে ভোগেন কেন? আমরা কি কখনো ভাবি, এর কারণ কী?প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হয়, ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য বা থিম হলো: “Lived Experiences Heard: Real Voices, Real Change” যার বাংলা ভাবার্থ দাঁড়ায়-“বাস্তব অভিজ্ঞতা শুনুন: প্রকৃত কণ্ঠস্বর, প্রকৃত পরিবর্তন”।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ (WFMH) যৌথভাবে এই প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—যারা নিজেরা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বা রোগের মধ্য দিয়ে গেছেন বা যাচ্ছেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং মতামতকে মূল্যায়ন করা। তাদের কণ্ঠস্বরকে প্রাধান্য দিয়েই যেন মানসিক স্বাস্থ্য খাতের নীতি নির্ধারণ, সমাজিক সচেতনতা এবং চিকিৎসা সেবার মান উন্নত বা পরিবর্তন করা হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব তুলে ধরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু এই বিশেষ দিনেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবি, নাকি প্রতিদিনের জীবনেও নিজের ও অন্যের মানসিক সুস্থতার প্রতি যত্নশীল হই? বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য বলছে, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬.৮ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১৩.৬ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত। অথচ আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ কোনো ধরনের চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আসেন না। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সচেতনতার জায়গায় এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে।

 

একজন শিক্ষার্থীর কথাই ধরা যাক। ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, ভালো ফলের প্রত্যাশা, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা—সবকিছু সামলাতে গিয়ে সে কখনো কখনো নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের কথাই ভুলে যায়। অন্যের ভালো ফল, সাফল্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো জীবন দেখতে দেখতে নিজের জীবনকেও ব্যর্থ মনে হতে পারে। অথচ আমরা কি কখনো জানতে চাই, হাসিমুখে সবার সঙ্গে মিশে থাকা মানুষটির ভেতরেও কোনো চাপ জমে আছে কি না?

 

আবার একজন মা, সবে যিনি সন্তানের মা হয়েছেন, তাঁর কথাই ভাবুন। নতুন দায়িত্ব, শারীরিক পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি ও নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে তাঁর মানসিক অবস্থার কথা অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। পরিবারের সদস্যরাও হয়তো ভাবেন, মা হয়েছেন, সবকিছুই তো স্বাভাবিক। অথচ তাঁরও মন খারাপ হতে পারে, একাকিত্ব বোধ হতে পারে, মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। একজন মায়ের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি তাঁর মনের যত্নও যে প্রয়োজন, তা আমরা কতটা ভাবি? তবে আমাদের সমাজে সবাই যে এমন, তা নয়। অনেকেই সচেতন, অনেক পরিবারই আপনজনের মানসিক অবস্থার খোঁজ রাখে। কিন্তু এই সচেতনতা সবার মধ্যে সমানভাবে গড়ে ওঠেনি। এখনো কেউ মানসিক কষ্টের কথা বললে তাঁকে বলা হয়, ‘এত ভাবো কেন?’, ‘মন শক্ত করো’, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ কথাগুলো হয়তো সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলা হয়, কিন্তু সব সময় কি তা কাজে আসে? কখনো কখনো মানুষ পরামর্শের চেয়েও বেশি চায়, কেউ তার কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক, তাকে বুঝতে চেষ্টা করুক।মানসিক চাপের কারণ অনেক কিছু হতে পারে। তবে ব্যক্তিভেদে এর কারণও আলাদা। কেউ বড় কোনো সমস্যায় পড়েন, আবার কেউ ছোট কোনো বিষয়েও গভীর মানসিক কষ্ট অনুভব করতে পারেন। বিষয়টি অনেকটাই ব্যক্তির মানসিক অবস্থা ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিনের মানসিক কষ্টকে অবহেলা করলে তা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। কখনো কখনো মানুষ এতটাই অসহায় বোধ করেন যে জীবন নিয়েও হতাশ হয়ে পড়েন। তাই কারও কষ্টকে ছোট করে দেখা নয়, বরং তাঁর পাশে দাঁড়ানো জরুরি। আমরা সচেতন হওয়ার কথা বলি, কিন্তু কাজের বেলায় কতটা সচেতন? কোনো মর্মান্তিক ঘটনা যখন পত্রিকার পাতায় দেখি, তখন কিছুটা অনুধাবন করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু-একটি সহানুভূতিমূলক কথা লিখি। কিন্তু কয়েক দিন পর আবার আগের মতোই হয়ে যাই। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য শুধু কোনো বিশেষ দিবসের আলোচনার বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের অংশ। আমাদের প্রতিদিনের আচরণ, কথা ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।

 

এবার আসি প্রবীণদের কথায়। আমরা ভাবি, সমাজের মানুষ ভাবে, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও হয়তো ভাবেন—তাঁদের আবার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে কেন? তাঁদের ভালো খাবার দিচ্ছি, চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি, প্রয়োজনীয় সবকিছুই তো আছে। তাহলে আর কী চাই? কিন্তু একবার ভাবুন, মন খারাপ থাকলে কি শুধু এসবেই কাজ হয়? তাঁরা কী চান? হয়তো চান, তাঁদের সন্তান কিছুটা সময় পাশে বসুক, গল্প করুক, দিনের ছোটখাটো ঘটনা ভাগ করে নিক। তাঁরা চান, কেউ তাঁদের কথাগুলো মন দিয়ে শুনুক। ভালো খাবার ও চিকিৎসার পাশাপাশি আপনজনের সঙ্গও তাঁদের কাছে অনেক মূল্যবান। অথচ ব্যস্ততার অজুহাতে আমরা সেই সময়টুকুও দিতে পারি না। একই বাড়িতে থেকেও কখনো কখনো মানুষ একে অপরের কাছ থেকে কত দূরে সরে যায়!

 

আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার হঠাৎ মন খারাপের কারণ কী? চারপাশে সবাই আছে, তবু কেন মনে হচ্ছে আপনি একা? কখনো কি নিজের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন? আমরা অন্যের খোঁজ নিতে ব্যস্ত, অথচ নিজের মনের খোঁজ নেওয়ার সময়টুকু বের করতে পারি না। নিজের সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতিগুলোকে চিনতে শেখা এবং প্রয়োজন হলে অন্যের সঙ্গে সেগুলো ভাগ করে নেওয়াও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

 

তাহলে আমরা কীভাবে মানসিকভাবে ভালো থাকব?

প্রথমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযত হতে হবে। হ্যাঁ, এটি যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এক মুহূর্তে পৃথিবীর নানা প্রান্তের খবর আমাদের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু এই মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা কিংবা অনবরত নোটিফিকেশনের ভিড় আমাদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। তাই কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থাকুন। মনে রাখবেন, ভার্চুয়াল জগতে অনেক মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা আর বাস্তব জীবনে কারও সঙ্গে মনের যোগাযোগ থাকা এক বিষয় নয়।

 

দ্বিতীয়ত, নিজেকে সময় দিন। সকাল কিংবা সন্ধ্যায় নিজের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটান। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাস, পাখির কিচিরমিচির, সন্ধ্যার গোধূলি, পাখির ঘরে ফেরার তাড়া, রাতের জোছনাভরা চাঁদ, আকাশের তারা—প্রকৃতির এই ছোট ছোট সৌন্দর্যগুলো মন দিয়ে দেখুন। ব্যস্ততার মধ্যে থেমে চারপাশের দিকে তাকান। দেখবেন, জীবনের আনন্দ সব সময় বড় কোনো অর্জনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না; কখনো কখনো তা ছড়িয়ে থাকে খুব সাধারণ কিছু মুহূর্তে।

 

তৃতীয়ত, প্রিয় মানুষগুলোকে সময় দিন। একান্তই তাঁদের, যাঁরা আপনার সঙ্গে কথা বলার অপেক্ষায় থাকেন। তাঁদের খোঁজ নিন, তাঁদের কথা শুনুন। আর আপনার কাছের কেউ যদি মন খারাপের কথা বলেন, তাঁকে বিচার না করে বোঝার চেষ্টা করুন। সব সমস্যার সমাধান আপনার জানা থাকতে হবে, এমন নয়। কখনো কখনো পাশে থাকা, মন দিয়ে শোনা এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য করাই যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। নিজের মানসিক কষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা তা দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেললে বিশ্বস্ত মানুষ ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নিন। মনে রাখবেন, সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়। পৃথিবীতে ভালো-মন্দ, আনন্দ-কষ্ট, সুখ-দুঃখ থাকবেই। জীবন সব সময় আমাদের মনের মতো হবে না। তবু মনে রাখতে হবে, জীবনটা রঙিন। চারদিকে নানা রং ছড়িয়ে আছে। যতটুকু আমরা দেখতে পারি, অনুভব করতে পারি, গ্রহণ করতে পারি, ততটুকুই আমাদের জীবন রঙিন হয়ে ওঠে। মন খারাপ মানেই জীবন থেমে যাওয়া নয়। খারাপ সময়ের মধ্যেও ভালো থাকার সম্ভাবনা থাকে, যদি আমরা নিজেদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দিই এবং প্রয়োজনে একে অপরের পাশে দাঁড়াই।

 

তবে দেরি কেন? আসুন, নিজের যত্ন নিই, অন্যের মনের কথাও শুনি। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংকোচ নয়, সচেতনতা বাড়াই। এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে মানুষ নিজের কষ্টের কথা বলতে ভয় পাবে না, যেখানে কাউকে তার মানসিক অবস্থার জন্য ছোট করা হবে না। কারণ, শরীরের সুস্থতার মতো মনের সুস্থতাও গুরুত্বপূর্ণ। আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শুরুটা হতে পারে তার মনের কথা মন দিয়ে শোনার মধ্য দিয়েই।

 

শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

showarakhatun@gmail.com

ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted