ঔষধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমানোর উপায়

আর্টিকেল এর সূচিপত্র

যদি রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক, কিন্তু ঔষধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমানোর উপায় রয়েছে। উচ্চ রক্তচাপ বলতে বোঝায় হাইপার টেনশন বা হাই প্রেসার। বাংলাদেশের মতো দেশে এটি বেশ সাধারণ একটি সমস্যা। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিনিয়ত উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রেসার হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার কারণে এসব রোগীরা বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতি পাঁচ জন মানুষের একজন মানুষ উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশনে আক্রান্ত। এবং বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ (৫৯ শতাংশ) জানেনই না তারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ১৪০/৯০ মিলিমিটার পারদ চাপ হলে তাকে সাধারণত উচ্চ রক্তচাপ বলে। বাংলাদেশের উচ্চ রক্তচাপকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে “প্রেশার” বলে অভিহিত করা হয়। আজকের পোস্টে আমরা ঔষধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমানোর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

১) পটাশিয়াম যুক্ত খাবার গ্রহণ করুন

উচ্চ রক্তচাপ হলেই অনেকেই প্রথম থেকেই ট্যাবলেট গ্রহণ করা শুরু করে দেন। উচ্চ রক্তচাপ মাত্রাতিরিক্ত হলে সে ক্ষেত্রে কথা আলাদা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলু, মিষ্টি আলু, কলা মটরশুঁটি, কসমিস, আলুবোখারা, টমেটো ইত্যাদি পটাসিয়ামযুক্ত খাবার খেলে উচ্চ রক্তচাপ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসতে থাকে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায়, যারা তাদের প্রতিদিনের খাবার তালিকায় পটাশিয়ামযুক্ত খাবার বেশি রাখেন তারা উচ্চ রক্তচাপে তুলনামূলক কম আক্রান্ত হন।

২) কালো চকলেট বা ডায়েট চকলেট খেতে পারেন

যারা চকলেট প্রেমী রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনা বেশ সহজ। একটি ভাল মানের ডার্ক চকলেট কমপক্ষে ৭০ শতাংশ কোকো থাকে। যারা চকলেট খেতে পছন্দ করেন তারা প্রতিদিন মাঝারি সাইজের দুইটি ডার্ক চকলেট খেয়ে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন প্রয়োজনের বেশি ডার চকলেট খেলে ওজন বৃদ্ধি পাবে যেটা বিপরীতভাবে আপনার উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।

৩) শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট এড়িয়ে চলুন

বাঙালিরা তাদের খাবার তালিকায় শর্করা জাতীয় খাবার বেশি রাখেন। শর্করা জাতীয় খাবারের মধ্যে রয়েছে ভাত, নুডুলস, ইত্যাদি। এসব খাবার উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে যেমন সাহায্য করে ঠিক একইভাবে ওজন বৃদ্ধি করতেও সাহায্য করে। প্রচুর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য টোফু বা দুধের তৈরি জিনিস খেতে পারেন। সয়াবিন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ ভালো।

৪) মানসিক চাপ কমিয়ে আনুন

আপনি যখন মানসিকভাবে চাপের মধ্যে থাকেন তখন আপনার পেশিগুলোতে আকস্মিকভাবে চাপের সৃষ্টি হয়। মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেলে ঘুম কম হয় এবং পক্ষান্তরে খুব দ্রুত প্রেসার বেড়ে যায়। আপনি যাতে মানসিক চাপ ধরে রাখতে পারেন সেজন্য কমপক্ষে প্রতিদিন ২০ মিনিট হালকা-পাতলা ব্যায়াম, ইয়োগা বা মেডিটেশন করতে পারেন। যদি কোনটাই সম্ভব না হয় তাহলে অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি স্পিডে হাঁটতে পারেন। সর্বোপরি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে।

৫) প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটাচলা করুন

ঔষধ ছাড়াই যদি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাহলে প্রতিদিন শারীরিক ব্যায়াম বা হাঁটাচলা করুন। তবে শরীর অতিরিক্ত খারাপ লাগলে হাঁটতে বের না হওয়ায় ভালো। শারীরিক সুস্থতা থাকলে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি থেকে স্বল্প স্পিডে হাটাহাটি করতে পারেন, যা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য খুবই কার্যকর।

৬) খাদ্য তালিকায় আদা রাখুন

আদা যে কোন অসুখের জন্য একটি সুপার ফুড হিসেবে বিবেচিত হয়। খুব দ্রুত পেশি শিথিল করার জন্য আদা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি খাদ্য উপাদান। ঔষধ ছাড়াই প্রচুর রক্তচাপ কমানোর জন্য আপনার খাদ্য তালিকায় আদা অবশ্যই রাখুন।

৭) প্রক্রিয়াজাত এবং তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন

প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন খাবারে অধিক মাত্রায় তেল এবং চিনি থাকে। তেল এবং চিনি উভয়ই উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলার পাশাপাশি তৈলাক্ত খাবার, অধিক চর্বিযুক্ত খাবার, খাবারে অত্যাধিক লবণ গ্রহণ করা ও পরিত্যাগ করুন। সর্বোপরি যেসব খাবার খেলে উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি পায় সে প্রত্যেকটি খাবার আপনি আপনার খাবার তালিকা থেকে সরিয়ে রাখুন।

৮) সোডিয়াম গ্রহণ কমিয়ে দিন

প্রতিদিন ২,৩০০ মিলিগ্রাম (প্রায় এক চা চামচ লবণ) আপনার শরীরের জন্য যথেষ্ট। তবে যারা ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের জন্য হাফ চা চামচ লবণ যথেষ্ট। প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন খাবারে অধিক পরিমাণে লবণ থাকে। তাই প্রক্রিয়াজাত খাবার বর্জন করুন এবং ঘরের খাবারেও লবণের মাত্রা কমিয়ে আনুন। মনে রাখবেন ঔষধ ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য অবশ্যই সোডিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

৯) ধূমপান ত্যাগ করুন

উচ্চ রক্তচাপ বাড়ানোর জন্য ধূমপান যথেষ্ট। ধূমপান উচ্চ রক্তচাপ বাড়ানোর পাশাপাশি তীব্রভাবে রক্তনালীর ক্ষতি করে। ধূমপান কমিয়ে আর উচ্চ রক্তচাপ কমে যাবে এবং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপযোগী হবে। হঠাৎ করে ধূমপান বন্ধ করতে না পারলে অবশ্যই স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কারীদের বিশেষ সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।

১০) স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন

বর্তমানে আপনার যে ওজন রয়েছে তার থেকে সামান্য কিছুটা ওজন কমিয়েও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। আপনার যদি পেটে মেদ থাকে তাহলে তা উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। সুতরাং ওজন কমানোর সময় পেটের মেদের দিকে নজর রাখুন এবং কোন কারনে নিজের বুঝতে সমস্যা হলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হন এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করুন।

১১) জবা ফুলের চা পান করুন

দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করলে তা উচ্চ রক্তচাপ কমানোর জন্য সহযোগী তা সবাই জানে। কিন্তু জবা ফুলের চা পান করলে খুব দ্রুত উচ্চ রক্তচাপ নিরাময় হয় এটা অনেকেই জানেনা। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ফুটিয়ে তার মধ্যে একটা জবা ফুল দিয়ে আরো কিছুটা সময় ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। এই জবা ফুলের চা দিনে অন্তত দুই থেকে তিনবার পান করলে উচ্চ রক্তচাপ ঔষধ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণে আসবে।

১২) লাল বিটের রস এবং ভেষজ চা পান করুন

ভেষজ চা এর মধ্যে থাকে উদ্ভিজ্জ পদার্থ, ফেনোলিক এসিড। খুব দ্রুত রক্তচাপ কমিয়ে আনতে এই দুইটি উপাদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন লাল বিটের রস এক গ্লাস করে পান করেন তাদের কোনরকম ঔষধ ছাড়াই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে।

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান সম্পর্কে আমরা আজকের পোস্টে আলোচনা করেছি। কিন্তু আপনি যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদান উচ্চ রক্তচাপ নিরাময়ের জন্য গ্রহণ করার পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন এবং ঔষধ ব্যতীত আপনি সুস্থ হতে পারবেন কিনা তা ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন।

শেষ কথা 

প্রিয় পাঠক পাঠিকা, আজকের আর্টিকেলে আমরা আপনাদের জন্য ঔষধ ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ কমানোর উপায় অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তচাপ কমানোর উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যারা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে চিন্তিত তাদের জন্য আজকের আর্টিকেলটি গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে আশা করছি। সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি জুড়ে আমাদের সাথে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং এমন তথ্য বহুল আর্টিকেল পাওয়ার জন্য আমাদের ওয়েবসাইটের সাথেই থাকুন।

সর্বাধিক জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলো

১) উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ কি?

উঃ উচ্চ রক্তচাপের লক্ষণ হলো তীব্র বুকে ব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি, অত্যাধিক প্রসাব, সার্ভিকাল লিম্ফ্যাডেনোপ্যাথি, কাশি থেকে রক্ত পড়া ইত্যাদি ‌

২) কোন খাবার BP বাড়ায়?

উঃ কলা, ডাবের পানি, টমেটো, ক্যাফিন যুক্ত পানীয়, স্যুপ, কফি, ফলের রস, দুধ, শরবত ইত্যাদি প্রেসার বাড়াতে সাহায্য করে।

৩) রক্তচাপ কমানোর দ্রুত উপায় কি?

উঃ দ্রুত রক্তচাপ কমানোর জন্য অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলুন, মানসিক চাপ এবং রাগ কমিয়ে আনুন, প্রতিদিন কমবেশি ব্যায়াম করুন, পরিমিত পরিমাণে পানি পান করুন।

আর্টিকেলটি ভালো লাগলে আপনার পরিচতদের সাথে শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Twitter
Email
Print
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments